গাঁও গেরামের গল্প

—- গাজিবর রহমান

(নাট্য গবেষক)

***************************************************

আমরা সাধারণত গাঁও বলতে বুঝি, কয়েকটি বাড়ি, কিছু কুঁড়েঘর, দুই একটি ভবন, পাঠশালা, একটি মসজিদ, একটি মন্দির, অন্যান্য উপাসনালয়, একটি বা দুটি পুকুর, এমন একটি জায়গা যেখানে সাধারন মানুষ এমনকি সাধারন খাবার জিনিসপত্র এবং অতি সাধারণ  পোশাক পরিহিত মানুষের বসবাস তাকে আমরা গাঁও বলে থাকি।

গেরাম বলতে বুঝি, সাধারণ জনবসতি একটি একক। একটি প্রধানত কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে মানুষ্য সম্প্রদায়ের ছোট বসতি।

কৃষিকাজ ও কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন ছোট-খাটো কাজের লোক বসবাস করে যেমন কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে বিভিন্ন কর্মের খুব সাধারণভাবে জীবন যাপন করে থাকে। গেরাম সাধারণত বড় শহর বা রাজধানী থেকে  অনেক দূরে অবস্থিত হয়।

গল্প বলতে আমরা বুঝি, আখ্যান ও উপখ্যান গল্প বা কাহিনী বলতে কোন একটি ঘটনা বা ধারাবাহিক সম্পর্কযুক্ত একাধিক ঘটনার লিখিত বা কথিত বর্ণনা কে বুঝায়।

কোন জাতির পরিচয় বহন করে গাঁও গেরামের গল্প ও পল্লী সংস্কৃতি আর সাহিত্য। মানুষের সৃষ্টি সব বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হল একটি জীবন প্রণালী। গাঁও গেরামের মানুষ যা করে, যা ভাবে, যা কিছু সে ব্যবহার করে এমন সকল কিছুই তার পল্লী সংস্কৃতি। পল্লী সমাজের মানুষ নানা ধরনের পেশার সাথে যুক্ত থাকে, ফলে সে যে আচরণ করে, যা সৃষ্টি করে বা যে ভূমিকা রাখে তার একত্রিত রুপই হলো গাঁও গেরামের সংস্কৃতি। যেসব পেশাজীবী গেরামে বসবাস করে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চাষা, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমোর, মাঝি, দর্জি, কবিরাজ, ডাক্তার, ওঝা, বৈদ্য, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত প্রকৃতি। এদের সবার সংস্কৃতি হল গাঁও গেরামের সংস্কৃতি।

সাহিত্য কাকে বলে ? সাহিত্য কত প্রকার ও কি কি: আমরা বাঙালি এবং আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকি। আমরা বাংলা ভাষার মাধ্যমে আমাদের মনের ভাব একে অন্যের কাছে প্রকাশ করে থাকি। আমরা যখন আমাদের মনের ভাব বিশেষ কোনো সৃজনশীলতার মাধ্যমে লিখিত আকারে প্রকাশ করে থাকি তখন তা সাহিত্য হিসাবে ধরা হয়ে থাকে। সাহিত্য সৃজনশীল আকারে প্রকাশ করা হয় বলে একে শিল্প হিসেবে ধরা হয়। মানুষের মনের ভাবকে একমাত্র সাহিত্যের মাধ্যমে শিল্প হিসাবে প্রকাশ করা সম্ভব। নাটক সাহিত্যর একটি বিশেষ ধারা। সাধারণত নাটক একটি লিখিত পান্ডুলিপি যা অভিনয় করে পরিবেশন করা হয়। নাট্যকার মূলত নাটক লিখে থাকেন অভিনয় করার জন্য। নাটকের স্থান, কাল ও পরিবেশের পাশাপাশি সংলাপ থাকে। সংক্লাপের মাধ্যমে মানব-মানবির জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। নাটক হল এমন এক ধরনের সাহিত্য যার মাধ্যমে সরাসরি দর্শকের সামনে মানব-মানবির বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করা হয়। সাহিত্য প্রধানত তিনটি বড় ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে যেমন গদ্য, পদ্য এবং নাটক। আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি আজ বিশ্বের অন্য জাতি থেকে করেছে আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তবে এখন আর খুব একটা দৃশ্যমান নয় বাংলা ও বাঙালি জাতির সংস্কৃতির ঐতিহ্যগুলো। আধুনিকতার স্পর্শ আর সভ্যতার ক্রমবিকাশে হাজার বছরের লালিত বাংলার প্রতিটি ক্ষেত্র আজ বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে গ্রাম বাংলার দৃশ্যপট। অতীতে গ্রাম বাংলার প্রতিটি বাড়িতে ছিল আমদ-প্রমোদের কতইনা আয়োজন। দিনান্তের ক্লান্তি শেষে প্রতিটি মানুষ তাদের নিজস্ব নীড়ে ফিরে রাতে বিনোদনের উদ্দেশ্যে সবাই একত্র হয়ে একটা বাড়িতে আসর জমাতো। তখন বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ছিল বিভিন্ন পালা গান, পালা নাট্য, যাত্রাপালা, জারি ও সারি গান, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, রাখালি, গাজীর গান, মারফতি, রাজকন্যার গল্প, ভাওইয়া, বাউল গানের আসর, পুঁথিপাঠও ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। চৈত্র-বৈশাখ মাসে গরমের প্রকোপ সহ্য করতে না পেরে খোলা আঙ্গিনায় শুয়ে মা দাদীর মুখে শুনেছি কতইনা ডালিম কুমারের আর রাজকন্যার গল্প, এবং খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আঙ্গুল দিয়ে মা দেখিয়ে দিত কোনটা শুকতারা, কোনটা সন্ধ্যা তারা, কোনটা তিনতারা, কোনগুলোকে বলা হয় টিটকি পুঁটির ঝাঁক আর কোনটা সপ্তর্ষি এইভাবে একটা একটা করে মা আমাদের গল্প করত আর তারা চেনাত। এসবই ছিল গাঁও গেরামের গপ্পো ও বাস্তব চিত্র।

হারিকেন অথবা কুপি জ্বালিয়ে মাঝখানে একজন বসে পুঁথি পাঠ করতো আর আসরের সবাই তা মনোযোগ দিয়ে শুনত। তারা এ আসরে বসে নিজেরা গল্প গুজব করত, হাসি-ঠাট্টা করত নিজেদের সুখ ও দুঃখগুলো একে অপরের কাছে ভাগাভাগি করে নিত। মানুষগুলো একে অপরকে কত সহজে বিশ্বাস করতো । তাদের মধ্যে ছিল সরলতা, ছিল নিবিড় আত্মার সম্পর্ক। কিন্তু এখন আর তেমনটা দেখা যায় না গাঁও গেরামে। আজ আমাদের সমাজ সুশীল সমাজ হিসেবে স্বীকৃত। এখানে নেই কোন ভালোবাসা, নেই কোন প্রেম, নেই কোন মানুষে মানুষে মমত্ববোধ সব কিছু হয়ে গেছে যান্ত্রিক ও রোবট। এ সমাজ কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে। সবাই যে যার মত ব্যস্ত। সময় অতি দ্রুত চলে যাচ্ছে আর আমাদের জীবনের স্বাদ যেন অপূর্নই থেকে যাচ্ছে। হিংসা ও প্রতিহিংসায় চলছে আমাদের দিনাতিপাত। যদি অতীত আর বর্তমান অবস্থার মধ্যে তুলনা করা হয়, তাহলে বিস্তর ফারাক দেখতে পাওয়া যায়।

গাঁও গেরামের প্রকৃতির প্রেম সেই বুঝবে, যার শৈশব কৈশোর বাল্যজীবন কেটেছে গাঁও গেরামে। সে এক মধুর স্মৃতি, শহরের চেয়ে গাঁও গেরামের প্রকৃতির সৌন্দর্য অনেকাংশেই বেশি। বর্ষাকালে পুকুরে নেমে কতইনা জলের খেলা খেলেছি। শাপলা তুলে তার মালা গেঁথেছি বন্ধু বান্ধবীদের সাথে। তার জন্য মায়ের কাছে কতইনা বকুনি খেতে হয়েছে। লুকোচুরি খেলতে খেলতে বেলা চলে গেছে, তারপর বাড়ি ফিরে এলে মায়ের সেই চোখ রাঙ্গানি আর বকুনি। সেইসব কথা আজও আমার স্মৃতির পটে ভেসে উঠে, চোখে আসে জল। সেই বিলের জলে মাছ ধরতে যাওয়া কতই না আনন্দ। কাদা-পানি সেঁছে কলমি লতার ভিতর থেকে শিং মাছ টেনে আনা কতই না আনন্দের ব্যাপার। মাঠে রাখাল বন্ধুর সঙ্গে গরুর, ছাগল ও ভেড়া ছড়াতে গিয়ে তাদের সঙ্গে গাছের ছায়ায় বসে মটর শুঁটি আর বুটের হুড়া আগুনে পুড়িয়ে খেয়েছি কত। আর রাতের বেলা দুষ্ট ছেলেদের সঙ্গে মিশে কতইনা আম চুরি, কলা চুরি, আর ডাব চুরিতে গেছি।

প্রযুক্তির যন্ত্রসঙ্গীতের আড়ালে গ্রামীণ সংস্কৃতির সেই ভাটিয়ালি, ভাওইয়া গানগুলো কৃষক ও রাখালদের মাঝে আর শোনা যায় না। শোনা যায় না রাখালের বাঁশির সেই মনটানা বাঁশরী সুর। দেখা যায় না বিশাল চরে রাখাল চরানো গরু, মোষ, ছাগল ও ভেড়ার পাল। মহিষের পিঠে রাখালের সওয়ার। দল বেঁধে পথ চলা গোধূলি লগ্নে গরু মহিষের দীর্ঘ সারি। খটখট করে চলা গরু ও মহিষের  গাড়িও তেমন একটা নজরে পড়ে না এখন। ঘোড়ার গাড়িও ঠিক নজরে পড়ে না এখন। শোনা যায় না গেরামের বালিকার সেই আকুতি দরদ মাখানো প্রেমের কলি–

ওকি গাড়িয়াল ভাই—

 হাঁকাও গাড়ি তুমি চিল মারির বন্ধ রে

নারীর কন্ঠে বিরহ ভরা এই গান আর আমরা গাঁও গেরামের মেঠো পথে শুনতে পাইনা।

শহরের চাকচিক্য পোশাক পরিধি আসায় গ্রামীণ পোশাকে দেখা যায় না নারী-পুরুষদের শরীর। পশ্চিমা কালচারে মিশে গিয়ে দেশীয় সাজ পড়তে শুরু করেছে এখনকার প্রজন্মরা। জিন্স, টি শার্ট পোশাকে বুঝায় যায় না নারী না পুরুষ এমন এক শ্রেণীর কালচার গ্রহীতাদের। ঘরের গৃহিণীদের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ভোর না হতেই শোনা যেতো ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া ধান ভানার শব্দ আর গম পিসার জাঁতার শব্দ। ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গার সেই রকম মজার দৃশ্য আর গাঁও গেরামে  দেখা যায় না। দেখা যায় না চাকিতে ডাল ভাঙ্গার সেই দৃশ্য। শহরের কলকারখানা মেশিনেই ধান, গম, ডাল ভেঙ্গে আনে গৃহকর্তারা। দেখা যায় না গৃহিণীদের আলতা পরা রাঙ্গা পায়ে সিদ্ধ ধান মাড়ানোর দৃশ্য। পাকা সোনালী ধানে কৃষকের মাঠ ভরে যেত মৌ মৌ গন্ধে । তখন কৃষকেরা মাথাল মাথায় দিয়ে কাঁচি হাতে নিয়ে সবাই চলে যেত মাঠে এবং সবাই মিলে মনের “আনন্দে ধান কাটতো আর গান গাইতো।

আমার আইজা ভাই মাইজা ভাই কই গেলা রে

চল যাই চল মাঠের ধান কাটিতে”

এখন আর এইসব ধান কাটা ও ফসল কাটার গান আমরা শুনতে পাইনা। ধীরে ধীরে যেন উঠে যাচ্ছে এইসব।

প্রযুক্তির যন্ত্র সভ্যতায় হারিয়ে যেতে বসেছে পাড়া-গাঁয়ের কিছু কৃষি ক্ষেত্রের গ্রামীণ দৃশ্য। ভোর হলেই দেখা যেত কৃষকদের লাঙ্গল, জোয়াল, মই কাঁধে নিয়ে ছুটতে হতো ক্ষেত খামারে। কৃষক গরু ও মহিষের কাঁধে লাঙ্গল-জোয়াল বেঁধে টানা দুপুর পর্যন্ত হাল মারতো ক্ষেতগুলোতে। গ্রীষ্ম-বর্ষা ঋতুতে কৃষকদের মাথায় থাকতো মাথাল অথবা বড় মানের পাতা। মাথাল গুলো তৈরি হতো বাঁশ ও শালপাতার সাহায্যে রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গ্রামীণ কৃষকদের নিকট এটি স্মরণীয়। কৃষকের বউ কৃষাণী বেচারা স্বামীর জন্য অথবা দেওরার জন্য গামছায় কাঁচা মরিচ পেঁয়াজ ও পান্তা ভাত বেঁধে চলে যেত ক্ষেতে। স্বামী বেচারাও দীর্ঘক্ষণ হাল মারতে মারতে হাঁপিয়ে উঠে প্রতীক্ষা করতো কখন তার গিন্নি খাবার নিয়ে আসে। নিখাদ গাঁয়ের পোশাকে গৃহিণীকে দেখতে যেন অনন্য সুন্দর নারী। সেই অনুভূতি যেন শুস্কবোধে পরিণত। গরু ও মহিষের হাল এর পরিবর্তে এখন ট্রাক্টর উঠেছে।

যান্ত্রিকতার ব্যবহারে কাজ সহজতর হলেও গ্রামীণ এ দৃশ্যপট হারিয়ে যেতে বসেছে। কার্তিক নবান্নের কৃষক কৃষানের মধ্যে যে ধান মাড়ানির পিঠা উৎসবের আয়োজন ছিল লক্ষ্য করার মতো। তাছাড়া চাষবাদের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায় গ্রামের সেই উৎপাদিত শস্য গুলো দেখা যাচ্ছে না। শস্য গুলোর কয়েক বছর আগেও কৃষকের খেতে ও বাড়িতে দেখা যেত। দারিদ্রতার কারণে এসব শস্য চাষ করে কৃষকরা খাবারের ব্যবস্থা করত। কিন্তু সে চিত্র এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। যেসব শস্য কৃষকের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে সেগুলো হল— দুধ কাউন, সাঁটি কাউন, কুদা, চিনি, মাইড়ি, অহড়ল, এই সমস্ত ফসলগুলো আজ প্রায় বিলুপ্তর পথে।

এছাড়া গ্রামীণ সাংস্কৃতির মধ্যে হতে হারিয়ে গেছে উৎসবচিত্র। পৌষ পার্বণে প্রচন্ড শীতের মধ্যে গ্রামীণ ছেলে মেয়েরা মেতে উঠতো বিভিন্ন উৎসবে। পৌষ মাঘ মাসে ধান কাটার পরপরই চরের মধ্যে কলাপাতা ও খড় দিয়ে কুটির বানিয়ে চড়ুইভাতির আয়োজন করা হতো। সেই চড়ুইভাতীতে থাকতো রেকর্ড চালিত মাইক, কলের গান, এই সমস্ত বনভোজনের দৃশ্যও যেন আজকাল আর চোখে দেখা যায় না। এছাড়াও গ্রামীণ সংস্কৃতির বিয়ে, খাতনাসহ বিভিন্ন উৎসবে রেডিও প্রচলন এর গ্রামীণ আনন্দ উৎসবগুলো ছিল উপভোগ করার মত।

আগে গ্রামের বাড়ি গুলো দেখা যেত ছনের তৈরি ঘরের চাল। পাট খড়ি, ছন ও গাছের পাতায় বাঁশের বাতা বা কঞ্চি বাধা বেড়া। এসব বাদেও মাটির দেয়াল ছিল গাঁও গেরামের কোন কোন বাড়ি। এখন এগুলো তেমন সচরাচর আর চোখে মেলে না বলেই বলা যায়। বাড়ির আঙ্গিনার পাশেই ছিল মাটির কুপ বা কুয়া ও ইঁদারা। কুয়ার থেকে পানি তুলে গৃহস্থালি, পরিবার পরিজনদের পানির চাহিদা মেটাত। এই সব কিছু হারিয়ে যেতে বসেছে সভ্যতার সব পরিবর্তনের ফলেই মানুষের জীবনযাত্রা অগ্রগতি হওয়ায় পিছনের সমাজ সংস্কৃতি হারিয়ে যায় যেন মহাকালের মহাগহ্বরে। তবে সচেতন নাগরিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিলুপ্তির পথে গাঁও গেরামের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

আমাদের গাঁও গেরামের সাংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শিশু-কিশোরদের ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। গাঁও গেরামের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে, বাঁচিয়ে রাখতে হলে আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আমাদের ঐতিহ্যবাহী গাঁও গেরামের সংস্কৃতি বিশ্বের জন্য জাতি থেকে করেছে আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তবে এখন আর খুব একটা দৃশ্যমান নয় বাংলা ও বাঙালি জাতির সংস্কৃতির ঐতিহ্যগুলো। অতীতে গ্রাম বাংলার প্রতিটি বাড়িতে ছিল আমোদ ও প্রমোদের কতইনা আয়োজন। দিনান্তে ক্লান্তি শেষে প্রতিটি মানুষ তাদের নিজস্ব নিড়ে ফিরে রাতে বিনোদনের উদ্দেশ্যে সবাই একত্র হয়ে একটা বাড়িতে আসর জমাতো।

বাঙালি সংস্কৃতির সোনালী অতীত ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে। কালচক্রে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালি কৃষ্টি-কালচার, সংস্কৃতি-উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতির উপর বিজাতীয় আগ্রাসন ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে স্বদেশী সুসমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শেকড় আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ এসব দেশী ও বিভিন্ন ধরনের আয়োজন সাজানো হতো রূপসী বাংলার গ্রামে গ্রামে। বিশেষ কোন দিবস উপলক্ষে কিছু সংস্কৃতি আজও অস্তিত্বের জানান দেয়। যেমন লাঠির খেলা, নৌকাবাজ, হা-ডু-ডু খেলা ও ঘোড়দৌড়। বর্তমান প্রজন্মের শিশু কিশোররা ভুলতে বসেছে শৈশবের মানে। শৈশবের প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস উল্লাসে মাতামাতি আগের মত চোখে পড়ে না। বিশেষ করে নগর ও শহরের যান্ত্রিকতায় শৈশব জীবনে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। তারা বোধহয় ভুলে যাচ্ছে সেইসব মানে দুরন্তপনা। শৈশব মানুষ স্মৃতি ও স্বপ্ন জাগানিয়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাটানো সময়। শৈশবের সেই দূরান্তপনা এবং প্রকৃতির আলিঙ্গন থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে শহুরে প্রজন্ম। তারা পাচ্ছে না সোনালী রোদের ঝলমলে আলো। রোদেলা দুপুর । বর্নীল মেঘের ছায়া। রংধনুর অপূর্ব দৃশ্য। নির্মল উতলা বাতাসের দমকা হাওয়া । চার দেয়ালের ভিতরে যেন বন্দিত্বের সব আয়োজন। তবে গাঁও গেরামে এখনো শৈশবে মেতে ওঠার মত নানা চিত্র চোখে পড়ে। এখনো ডাক দিয়ে যায় দুরন্ত শৈশব।  বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষায় এবং সোনালী অতীত ও ঐতিহ্যের শেকড় পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ দরকার বলে সচেতন মহল মনে করেন।

পল্লী সাহিত্য ও সংস্কৃতি সমাজ মূলত সনাতন জীবনধারায় পরিচালিত হয়। অর্থাৎ পল্লী সমাজের বসবাসকারী মানুষ সুদীর্ঘকাল যাবৎ কোনরকম পরিবর্তন ছাড়াই একই ধরনের জীবন যাপন করে। পল্লী সমাজের অধিকাংশ মানুষগুলো হলো কৃষিভিত্তিক। এই গ্রামবাসীর লোকজন গুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত আছে। আবার তাদের মধ্যে  এখনো গরু ও মহিষের লাঙ্গলের সাহায্যে কৃষিকাজ করে থাকে। পল্লীর মানুষগুলো সাধারণত সহজ ও সরল হয়ে থাকে। তাদের পোশাক পরিচ্ছদ একেবারেই সাধারণ। তারা ভাত, মাছ, ডাল, শাক ও সবজি এদের প্রধান খাদ্য হলেও বিভিন্ন উৎসবে তারা তাদের সাধ্যমত ভালো-মন্দ খাবারের আয়োজন করে থাকে। পল্লী অঞ্চলে সাধারণত ঘরবাড়ি গুলো তৈরি হয়, মাটির, বাঁশ ও বেতের তৈরি বেড়া বাঁশের খুঁটি, এবং ছন ও খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরের অধিক লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ সমাজ জীবনে বিভিন্ন ধর্মের প্রভাব বহুলাংশে বিদ্যমান। আবহমান কাল ধরেই পল্লীর বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা একত্রে মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করছে, যা ধর্মীয় সহনশীলতা ও শান্তি প্রিয়তার লক্ষ্য বহন করে।

গাঁও গেরামের  সংস্কৃতির মধ্যে এখন অনেক কিছুই আর চোখে পড়ে না আগের মত। শিশু-কিশোরদের মধ্যে নেই কানামাছি বউ বউ, গোল্লাছুট, বৌচি,  কুতকুত, বাড়িয়াবাঁধা, ডাঙ্গুলী, মার্বেল, হা-ডু-ডু, কাবাডি, মোরগ লড়াই, ষাঁড়ের লড়াই, হাড়িভাঙ্গা, বদন খেলা, বাঘ-বকরি, লুকোচুরি ঢ়াং দড়ির লাফ, এক্কা-দোক্কা, আগডুম বাগডুম, পাতা খেলা, লুডু, রুমাল চোর খেলার মত খেলাগুলো।

অপরদিকে পল্লী গেরামের সংস্কৃতির মধ্যে বিয়ে উৎসবে যেসব যানবাহন ব্যবহার করা হতো সেগুলো আজ বিলুপ্তির পথেই বলা যায়। যেমন চার বেহারার পালকি, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি  চড়ে দূর থেকে দূরান্তে গাঁও গেরাম গুলোতে বিয়ের উৎসব অনুষ্ঠিত হতো সাথে থাকতো মাইক বাজানো হরেক রকম বিয়ের গান। এছাড়াও  সেই পল্লীর বিয়ে গুলোতে ব্যাপক আনন্দ ফুর্তি লক্ষ্য করা যেত। গায়ে রং ছিটানো হতো, মেয়েরা দল বেঁধে বিয়ে বাড়িতে সুন্দর সুন্দর বিয়ের গান গাইতো এবং বিভিন্ন আঙ্গিকে নৃত্য করত। সেগুলোর মধ্য ছিল এক প্রাণবন্ত আনন্দের মেলা। সেখানে বর ও কনে কে “কবুল” পড়ানো হতো। বিয়ের সময় কনে’রা পায়ে আলতা পড়তো । বিয়ের কাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ করে বাসায় ফিরে ফুলশয্যার বাসর ঘরের মধ্যে দিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই সকলে আবার নিজ নিজ কর্মব্যস্ততায় ফিরে যাওয়া দৃশ্য লক্ষণীয়।

কনে বাড়ি থেকে কনের সঙ্গে নানী, দাদি অথবা বোন সঙ্গে আসতো বরের বাড়িতে। কখন বরের বাড়িতে তাদের উদ্দেশ্য করে ইয়ার্কি মুলক অথবা মশকরা মূলক গান গাওয়া হতো। গানগুলা ছিল এই রকম যেমন—

কনের মা কনের মা, ঘোড়া ভাতারি লো–

পান দেনা খায়।।

পান মিলে চুন মিলে অমিল সুপারি লো–

পান দেনা খায়।।

কনের নানি কনের নানি  হাতি ভাতারি লো–

পান দেনা খায়।।

পান মিলে চুন মিলে অমিল সুপারি লো–

পান দেনা খায়।।

গাঁও গেরামে আরো দেখা যেত পল্লী প্রেমের চিঠির আদান প্রদান। পল্লী প্রেম ভালবাসা যেন খুবই বেমানান হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকের সময়ে। সে যুগের প্রেম ভালবাসাকে আনকালচারাল (Uncle channel) বলে ধিক্কার দিয়ে থাকে এখনকার প্রেমিক-প্রেমিকারা। অথচ পল্লীর সেই যৌবনে পা রাখা মেয়েটি তার প্রেমিকের জন্য অপেক্ষায় প্রহরের পর প্রহর দিন গুনতো। রাত জেগে লুকিয়ে লুকিয়ে চিঠি লিখতো নিখুঁত প্রেমের মনের গাঁথুনি দিয়ে। ষড়শি মেয়েরা প্রেমে পড়লে তারা আঁকাবাঁকা করে সুঁই সুতা দিয়ে রুমালের উপর লিখতো ‘ভুলোনা মোরে’ অথবা সুন্দর সুন্দর ফুলের নকশা আঁকতো। সেই রুমালে সুন্দর সুন্দর প্রেমের ছন্দ লিখতো । ছন্দ গুলো ছিল এই রকম,—

 “গোলাপ ফুল নড়েচড়ে

   বন্ধুর কথা মনে পড়ে”।।

 প্রেমিক ছেলেরাও তাদের মনের আবেগ জড়ানো কথাগুলো চিঠিতে ফুটিয়ে তুলতো। চিঠির ভেতর দেয়া হতো সুগন্ধি মাখিয়ে অথবা সুগন্ধি পাউডার মিশিয়ে। তারা চিঠিতে লিখতো–

“নিরালা নির্জন নিস্তব্ধ মনোরম ফিকফিকে সাহিত্যে কিরণ দান।

কর্মব্যস্ততায়রত এই অভাগা সঙ্গহীন জীবনে চেয়ার টেবিলে জমে হাজারো কাজের ভিড়, তারই ফাঁকে ফাঁকে মনে পড়ে যায় তোমার কথা” —

পোস্ট অফিসের ডাক বাক্স গুলো ভরে যেত চিঠিতে। পোস্ট অফিসের প্রিয় ডাক পিয়ন সাইকেল চালিয়ে পৌঁছে দিত প্রেমিকের কাছে সেই চিঠি। চিঠি পেয়ে প্রেমিক-প্রেমিকারা  উম্মাদের মত হয়ে উঠতো প্রিয় জনের লেখা সেই চিঠি পেয়ে। আজকাল এগুলো আর দেখা যায় না। পোস্ট অফিসের ডাক বাক্স গুলো চিঠি বিহীন নিঃসঙ্গ অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে। কতগুলো মরচে ধরে ভাঙতে শুরু করেছে। বর্তমান মোবাইলের খেলায় পল্লীর সেই অবলা নারীর কন্ঠে আর শোনা যায় না “চিঠি দিও প্রতিদিন নইলে থাকতে পারবো না”।

গ্রাম বলতে বোঝায় শহরের একটি বিপরীত শব্দ। গেরামের প্রতিশব্দ হলো, গাঁ, পাড়া বা পল্লী ইত্যাদি। গেরাম বলতে বোঝায় একটা কম ঘনবসতিপূর্ণ  অঞ্চল, যেখানে অনেক গাছপালা, জলাশয়, টাটকা ফলমূল, সবজি, মাছ, দুধ ইত্যাদি পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় মুক্ত বিশুদ্ধ বাতাস। বেশিরভাগ ঘর বাড়ি কাঁচা, রাস্তাঘাট সরু, আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, যানবাহন কম, মানুষের সাথে গৃহপালিত পশুর বাস। পক্ষান্তরে পল্লী বলতে বুঝায় একটি ছোট গেরাম। পল্লী সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের দিক বিবেচনায় উদ্দীপক ও পল্লী সাহিত্য একসাথে গাঁথা। গাঁও গেরামের পল্লী সাহিত্য একটি দেশের জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। গেরামের সাহিত্য একটি জাতির নৃতাত্বিক পরিচয় বিদ্যমান থাকে। পল্লী সাহিত্য মানুষের জীবনের বাস্তব রূপ প্রতিফলিত হয়ে থাকে। গাঁও গেরামের পল্লী সাহিত্যের গল্প এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে যা আমূল্য সম্পদ। সন্ধ্যা লাগলে হারকেল অথবা কুপি জ্বেলে বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে সোনাভানের কেতাব পাঠ করা হতো। চারিদিকে গোল হয়ে গাঁও গেরামের মানুষ  এসে বসতো সেই কেতাব পাঠ শুনতে। কেতাব যিনি পড়তেন তিনি সুন্দর সুর করে কেতাব পড়তেন।

ঘোড়তে চড়িয়া মরদো হাকিয়া চলিলো,

ছয় মাসের রাস্তা মরদো ছয় দিনে গেল।।

লাখে লাখে বীর মরে হাজারে হাজার,

একুনে গুনিয়া দেখো একুশো হাজার।।

এরপর হাটে, বাজারে সুন্দর পুঁথি বিক্রি করা হতো এবং সেই পুঁথিগুলো হকাররা সুন্দর সুর করে পড়তো। সেগুলো মানুষ প্রচুর পরিমাণে কিনতো এবং সন্ধ্যাবেলা সমস্ত কাজকর্ম সেরে বাড়ির পাশে খৈলানে বসে সেই পুঁথি পাঠ করা হতো। হারিকেনের ও কুপির আলোতে সেগুলো পাঠ করা হতো। আর সমস্ত গেরামের মানুষ এসে সেই পুঁথিপাঠের আসরে এসে বসতো। সেই পুঁথি গুলোর সুন্দর সুন্দর নাম ছিল। যেমন জরিনা সুন্দরী, সাত ভাই চম্পা, মামলার সাক্ষী ময়না পাখি, কালো গাজী চম্পাবতী, শাহজাহান বাদশা ইত্যাদি। পুঁথি গুলো  ছিল এই রকম–

বলি ভাইরে ভাই, বলে যাই আজব  এক ঘটনা,

সাপ খেলে সাপুড়ীর মাইয়া নামেতে জরিনা।।

জরিনার মা নাই, বাপ নাই দাদির সঙ্গে ঘুরে,

বেহুলা লক্ষিন্দরের গানে পরান পাগল করে।।

জরিনার বয়স ষোল, হাতে ছিল প্লাস্টিকের চুড়ি,

গলায় ছিল পুঁতির মালা, পরনে জাম শাড়ি।।

পল্লী মানে হল গেরাম। এই গাঁও গেরামকে কেন্দ্র করে যে সাহিত্য গড়ে উঠেছে তাকে বলা হয় পল্লী সাহিত্য। বর্তমান কালের বাংলার গেরামে গৃহস্থ, কৃষক, জেলে, মাঝি, মুটে, মজুদদের জীবানাচরণে যে সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে তাকেই বলা হয় গাঁও গেরামে গল্প বা সাহিত্য। সাহিত্য হলো সেই সৃষ্টিশীল শিল্প যা মানুষের অভিজ্ঞতা ভাবনা অনুভূতি এবং কল্পনার প্রকাশ করে। সাহিত্য সাধারণত গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ, পালা নাট্য ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। এটি মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্ক এবং সামাজিক ও মানসিক প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করে।

কোন জাতির পরিচয় বহন করে সংস্কৃতি। মানুষের সৃষ্টি সব বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হলো একটি জীবন প্রণালী। গেরামের এলাকায় বসবাসরত লোকের আচার-আচরণ ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন প্রণালী, রীতিনীতি নিয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তাই গাঁও গেরামের গল্প বা সাহিত্য। গেরামের এলাকার জনগণ যৌথ পরিবারের বসবাস করে । যৌথ পরিবার কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে । যৌথ পরিবারে পারস্পরিক বন্ধনে সদস্যরা বসবাস করে । গেরামীণ সমাজে জনসংখ্যার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত । সবাই পরস্পরের প্রতি সহনশীল বিপদে-আপদে একজন অন্যজনকে সাহায্য ও সহযোগিতা করে থাকে।

মানুষ  যা করে, যা ভাবে, যা কিছু সে ব্যবহার করে এমন সকল কিছুই গ্রামীণ সংস্কৃতি। কাজেই গেরামের মানুষ যে নানা ধরণের ‌পেশার সাথে যুক্ত থাকে, ফলে সে যে আচরণ করে যা সৃষ্টি করে বা যা ভূমিকা রাখে তার একত্রিত রুপই পল্লী সংস্কৃতি।  দেশের কৃষকরা শক্ত মাটির বুকে লাঙ্গল এর ফলা দিয়ে বলদের সাহায্যে মাটির বুক চিরে ফসল ফলায় আর মনের আনন্দে গান গেয়ে ওঠে–

‌ এমন মানব-জমিন রইল পতিত,

আবাদ করলে ফলতো সোনা।।

মনরে কৃষি কাজ জানো না।

চৈত্র-বৈশাখ মাসে বৃষ্টি না এলে আমাদের গেরামের ছেলেমেয়েরা ব্যাঙের সাথে ব্যাঙের বিয়ে দিত আর মাঙ্গনের গান গেতো এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল ডাল তুলে রান্না করে সবাই মিলে মিশে সারিবদ্ধভাবে বসে কলার পাতায় খেত। আর মনের সুখে গান গেয়ে উঠতো—

ব্যাঙাক বুলি ব্যাঙারু

কী কী গড়ন লিবুরু,

হাত ঝুমাঝুম পা ঝুমাঝুম

করোত কাটা মাকড়ি আরে কে।।

রাখাল বালকেরা গায়ে পানি ঢালতো আর কাঁদা জলের মাঝে লুটোপুটি খেত আর মেয়েরা কলসি কাংখে নিয়ে সেখানে সকলের গায়ে পানি ঢেলে  দিত আর সমসুরে গান গেয়ে উঠতো—-

আল্লাহ মেঘ দে, আল্লাহ মেঘ দে

আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে ছায়া দেরে তুই

আল্লাহ মেঘ দে

আসমান হইল টুডা টুডা জমিন হইল ফাটা

মেঘ রাজা ঘুমাইয়া রইছে মেঘ দিব তোর কেডা

আল্লাহ মেঘ দে ।।

গেরামের চারিদিকে কোকিল, দোয়েল, পাপিয়া, প্রভৃতি পাখির কলকাকলি, নদীর কুলু কুলু ধ্বনি, পাতার মর্মর শব্দ ভঙ্গিময় হিলাদুলা অসাধারণ এক সৌন্দর্য পেয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রচুর পরিমাণে অভাব এখানে পূর্ণ করে দিচ্ছে। পল্লীর ঘাটে মাঠে, পল্লীর আলো বাতাসে, পল্লীর প্রত্যেক পরতে পরতে সাহিত্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু বাতাসের মধ্যে বাস করে যেমন আমরা ভুলে যাই বায়ুর সাগরে আমরা ডুবে আছি। তেমনি পাড়া-গাঁয়ে থেকে আমাদের মনে হয় না যে, কত বড় সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপকরণ ছড়িয়ে আছে। সাহিত্যের কি এক অমূল্য খনি গাঁয়ের বুকের কোণে লুকিয়ে আছে। চোখের অগোচরে গেরামে আত্মগোপন করে আছে । কে তাদের সাহিত্যে ও সংস্কৃতির মজলিসে এসে জগতের সঙ্গে চেনাশোনা করিয়ে দেবে ? আজ যদি দেশের প্রত্যেক পাড়াগাঁয়ে থেকেই এইসব অজানা অচেনা কবিদের গাঁথা সংগ্রহ করে গীতিকারের গান, চারণ কবির ছড়া, পালাকারের পালা নাটক প্রকাশ করা হতো তাহলে দেখা যেত দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কত ধনী। কিন্তু হায় ! এ কালের জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল কই ?

আমরা গাঁয়ের বুড়ো বুড়ির মুখে কোন ঝিল্লি মুখর সন্ধ্যা কালে যেসব কথা শুনতে শুনতে ছেলেবেলায় ঘুমিয়ে পড়েছি, সেগুলো না কত মনোহর, কত সুন্দর। কত চমকপ্রদ। আরব্য উপন্যাসের আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপ, আলিবাবা ও চল্লিশ দুস্যু প্রভৃতির চেয়ে আমাদের পাড়া-গাঁয়ের রূপকথা গুলোর মূল্য কম নয়। আধুনিক শিক্ষার সর্বনাশা স্রোতে সেগুলো বিস্তৃতির অতল গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। এখনকার শিক্ষিত জননী সন্তানকে আর রাখালের পিঠা গাছের কথা, রাক্ষস বুড়ির ঘুমন্ত রাজকন্যার কথা বা পঙ্খীরাজ ঘোড়ার কথা শোনান না। তাদের কাছে বলেন আরোব্য উপন্যাসের গল্প। আমরা কথায় কথায় প্রবাদ বাক্য জুড়ে  দিই – যেমন বারো হাত কাঁকড়ের তেরো হাত বিচি, এক ঢিলে দুই পাখি, আলালের ঘরের দুলাল, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা, অটল বাবু পটল তুলে চলে গেছেন স্বর্গে লুচির সাথে পটল ভাজা খাবে সুজন বর্গে এইরকম আরো কত কি।

এরপর আছে আমাদের খনার বচন যেমন –যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ। আউশের ভুঁই বেলে, পাটের ভুঁই আঁঠালে। এইরকম আরো অনেক আছে।

গাঁও গেরামের ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন খেলাধুলায় তারা বিভিন্ন ধরনের ছড়া বলতো, আর মনের আনন্দে খেলাধুলায় মেতে উঠতো আসুন ছড়ার কথা বলা যাক যেমন-

*আজ স্কুলে যাবো না,

 বেতের বাড়ি খাবো না।

 *আজ স্কুল বন্ধ,

গোলাপ ফুলের গন্ধ।

*একহাত বোল্লা বারো হাত শিং,

উড়ে যায় বোল্লা ধা তিং তিং।

* রোদ হচ্ছে পানি হচ্ছে

খেঁকশিয়ালীর বিয়ে হচ্ছে।

এরকম প্রচুর আছে। এইসব ছড়া গুলো আমাদের গাঁও গেরামের ছেলেমেয়েরা কথায় কথায় ছড়া কাটতে থাকে। আর কতনা গ্রামীণ খেলার ছড়া তারা সমস্বরে ঝংকার দিয়ে  গেয়ে উঠত, আর কত না পাঁচালী গাইত।

বিদেশি খেলার প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে এসব লোপ পেয়েছে। কে এদের বাঁচিয়ে রাখবে ? তারপর ধরুন, আমাদের পল্লীগীতি গানের কথা, ভাওইয়া গানের কথা, ভাটি দেশের গানের কথা ভাটিয়ালি, রাখালি গানের কথা, মারফতি গানের কথা ইত্যাদি। আমাদের গাঁও গেরামের গানের এক অফুরন্ত ভান্ডার পল্লীর ঘাটে মাঠে হাটে বাজারে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে। তাতে  জমে আছে কত প্রেম, কত আনন্দ, আর অফুরন্ত সৌন্দর্য, কত তত্ত্বজ্ঞান ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে গাঁও গেরামের গায়ে গায়ে। শহুরী গানের প্রভাবে সেগুলো এখন বর্বর চাষার গান বলে ভদ্র সমাজে আর বিকায় না।

কিন্তু দেখুন

মনমাঝি তোর বৈঠা নে রে

আমি আর বাইতে পারলাম না।

 এই গানের ভিতরে ছড়িয়ে আছে কত রস, কত সুর, কত প্রেম, কত সুখ, কত দুঃখ, কত ব্যথার কথা লুকিয়ে আছে।

চৈত্র-বৈশাখ মাসে কৃষকেরা জমিতে চাষ করার পরে বড় বড় ঢেলা শুকিয়ে থাকতো। সেই সমস্ত ঢেলা দিয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা ঢেলার উপর ঢেলা সাজিয়ে খেলার ঘর তৈরি করত এবং  নকল গেরাম তৈরি করত। এই খেলাপাতি ঘরে একজন মেয়ের সঙ্গে একজন ছেলের মিছামিছি বিয়ে হতো। মিছামিছি কবুল পড়তো তারা । আর মিছেমিছি সংসার করতো তারা। আবার এমনও দেখা যেত যে, কিশোর কিশোরীরা খেলাপাতি ঘর তৈরি করে,  বাতিল সিট কাপড় দিয়ে পুতুল তৈরি করে এক পুতুলের সঙ্গে আরেক পুতুলের বিয়ে দেওয়া হতো। একে বলা হতো পুতুল পুতুল বিয়ে বা পুতুল পুতুল খেলা।

গ্রীষ্মের খরা দুপুরে যখন বাপ-মা ঘুমিয়ে পড়তো তখন ছেলেরা খোলা মাঠে ঢোপ, কুঁয়াড়ি, ঢাউস, ঘুড়ি বা চিলি উড়াতো। আর সবাই মনের আনন্দে ছড়া কাটতো। সেই সমস্ত ছড়াগুলো ছিল নিম্নরূপ —

চিলি করে ঢিলিমিলি, কুঁয়াড়ি করে টান,

ঢাউস শালা উঠে বলে, আরো সুতা আন।।

গ্রামের যত দুষ্ট ছেলেদের সঙ্গে বন-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম আর খুদিজাম, ভূঁই কুমড়ার ডগা, পটকা ফল, আঁটিসোড়া বা মটকিলা ফল, কেসতি ফল, বেতফল, বনকাঁঠাল, বৈঁচি ফল, শিয়াকুল, ফলসা, তৈকর, অরবরই, মহুয়া ফল খুব ঝোপঝাড়ে খেয়ে বেড়াতাম। বর্ণে, ঘ্রাণে, স্বাদে ও আকৃতিতে এইসব ফলে রয়েছে বিপুল বিভা বৈচিত্র। এইসব সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বুনোফল আর বন জঙ্গলে দেখা যায় না।

আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে যখন চারিদিকে পানি থই থই করে । মাঠ ঘাট টইটুম্বুর হয়ে যায়। তখন গায়ের সকল বালক বালিকা মিলে কলা গাছের ভেলা তৈরি করে নতুন জলে মনের খুশিতে ভেসে বেড়াতাম। যখন মুষলধারে বৃষ্টি হতো পাঠশালায় অথবা হাটে, বাজারে যাবার সময় আমরা কলার পাতা, মনের পাতা মাথায় দিয়ে যেতাম বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।  ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বর্ষার জলে কাগজের নৌকা, কচু পাতার নৌকা তৈরি করে ভাসিয়ে  দিয়ে খেলা করত এবং মাঝে মাঝে ছড়া কাটতো —

আয় বৃষ্টি ঝেঁপে ধান দেবো মেপে,

লেবুর পাতা গরম চা

যা বৃষ্টি ঝরে যা

কালকে আসিস আজকে যা।

আবার কোন কোন পাড়ায় ছেলেমেয়েরা  বর্ষার গান গেয়ে উঠতো—

আইলো দেয়া ঈশানে,

সকালে কি বিকেলে

মাঠে ঘাটে নামলো পানির ঢলরে

নামলে পানির ঢল….

ঐ ঝিলে বিলে ঢেউ খেলেরে

ছলাত ছলাত ছল

আমরা আরও দেখতে পেতাম কিশোররা তাল পাতার বাঁশি বানাত, আম পাতার বাঁশি বানাত আরো বিভিন্ন গাছের পাতা দিয়ে তারা বাঁশি বানিয়ে বাজিয়ে বেড়াতো। আরো দেখা যেত আমের আঁঠি দিয়ে ভেঁপু বানিয়ে বাজিয়ে বেড়াতো। ভাত রান্না করার জন্য কিশোর কিশোরীরা শুকনো ঝরা পাতা ঝাড়ু দিয়ে বস্তায় ভরে বাড়ি নিয়ে আসতো। এদেরকে বলা হতো পাতা কুড়ানোর দল। কৃষকেরা যখন মাঠের পাকা ধান কাটতো আর কিছু কিছু ধান মাঠে পড়ে থাকত। সেগুলো সে আমলের কিশোর কিশোরীরা  কুড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসতো। পরে সেগুলো জমিয়ে মা নতুন ধানের মুড়ি ভেজে দিত।

গাঁও গেরামে আরো বিয়ে-শাদী হলে  সমাজের মানুষকে তারা দাওয়াত করত এবং সেই সময় বর  ও কনের বাড়িতে বড় বড় খানা হত । সেই খানাতে আমরা যেতাম। সেখানে কলার পাতায় খেতে দেওয়া হতো । সেগুলো এখন আর নেই । কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।

ঝিরঝির বাতাস বয়ে চলেছে । দাদু বারান্দায় বসে গড়গড় গড়গড় করে হুঁকায় টান দিচ্ছে। পাশে বটের ছায়াতলে বসে ছয় সাতজন গাঁয়ের বিবাহিত মেয়েরা একজনের পেছনে আর একজন আরেকজনের পেছনে আর একজন এইভাবে সারিবদ্ধ হয়ে বসে সকলে মিলেমিশে উকুন তুলতে ব্যস্ত। তারি ফাঁকে ফাঁকে চলছে সংসারের কথাবার্তা কে কেমন করে তরকারি রান্না করছে কার স্বামী কাকে ভালোবাসে। কার স্বামী কাকে দেখতে পারেনা এমনি চলতে থাকে বিবিধ ধরনের গল্প গুজব। এই সকল দৃশ্যপট এখন আর গাঁও গেরামে চোখে পড়ে না।

 সুতো কাটার জন্য যেমন চরকার প্রয়োজন হতো; তেমনি পাট থেকে দড়ি পাকানোর জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এটি আমাদের অঞ্চলে পাট্টাকুর নামে পরিচিত। (টাইকরিশ আঞ্চলিক নাম) কোথাও কোথাও আবার এটিকে শুধু টাকু নামে পরিচিত। পাটের দড়ি পাকানোর জন্য পাটের আঁটিটি উপরে কোন একটা (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটি হতো ঘরের আড়া) সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে একটা একটা করে পাটের আঁশ ছিঁড়ে নেওয়া হয় এবং সাথে সাথে পাট্টাকুর ঘোরানো (হাঁটুর উপরের অংশে পাক দিয়ে) দিতে হয়। তখন পাকের কারণে দড়ি তৈরি হতে থাকে। পরবর্তীকালে এই দড়ি কে প্রসেসিং করে বিভিন্ন রকমের দড়ি তৈরি করা হয়। ছোটবেলায় এভাবে বাবাকে দেখতাম এর থেকে দড়ি তৈরি করতেন। আবার দীর্ঘদিন পর যন্ত্রটিকে দেখতে পেলাম। শুধু তাই নয়, যন্ত্রটি খুব সাম্প্রতিক ব্যবহার হয়েছে সে বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া গেল। স্বভাবতই যন্ত্রটি এবং কর্মটি লুপ্তপ্রায়।কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে সনাতন পদ্ধতি গাঁও গেরামের সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী টাকু বা পাট্টাকুর।

আবার গাঁও গেরামের মেয়েরা এই সোনালী আঁশ পাটের সাহায্যে তারা রংবেরঙের ছিঁকা তৈরি করত। সেই ছিঁকায়  টাঙ্গিয়ে রাকতো বিভিন্ন রকমের মাটির রঙ্গিন  হাঁড়ি সাজিয়ে রাখা হতো। সেগুলো দেখতে খুব সুন্দর লাগতো।

আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে মফস্বলে বেদের দল আসতো। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাঁতে শিঙ্গা লাগাতো। তাদের সঙ্গে রাখত বড় বড় সাপ ও বানর। তারা ডুমরু বাজিয়ে সাপ ও বানরের নাচন দেখাতো। গাঁও গেরামের কিশোর-কিশোরী, বড়রা, ছোটরা, বৃদ্ধরা সবাই মিলে সেই বানর নাচ ও সাপের নাচ দেখে মুগ্ধ হতো।

আমাদের হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যবাহী শিল্পের নাম বায়োস্কোপ।চার কোনা বিশিষ্ট একটি টিনের বা কাঠের বাক্স গোলাকৃতি চার থেকে ছয়টি কাঁচের জানালা। বাঁশি বাজিয়ে আহ্বান জানিয়ে দুলদুল ঘোড়া, মক্কা-মদিনা, আজমীর শরীফ, ক্ষুদিরামের ফাঁসির ছবি ইত্যাদি দেখানো হতো বায়োস্কপে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, রাজা-বাদশা, জনপ্রিয় নায়ক নায়িকা, বিভিন্ন ধর্মীয় পবিত্র স্থাপনা, মৃত্যুর পরের নানা কাল্পনিক কাহিনীর পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশটি ছবি জোড়া দিয়ে লাগানো হতো। বাক্সের মধ্যে দুই পাশে দুটি ঘুড়ির লাটাইয়ের মত জিনিস থাকত যা পেঁচিয়ে স্থির ছবি চলমান রেখে প্রদর্শন করা হতো। বায়োস্কোপওয়ালা হাত দিয়ে হাতল ঘোরাতে থাকে আর সুর করে ছবির বর্ণনা দিতে থাকে।

আহেন আহেন আহেন দাদু

উবুদ হইয়া একটু দেখেন।।

“কি চমৎকার দেখা গেলো

ঢাকা শহর আইসা পড়লো—“

মীরজুমলার কামান দেখো

সদরঘাটের জাহাজ দেখো।।

কলকাতা শহর দেখো

দলমাদলের নাটক দেখো।।

বাইরে থেকে স্বচ্ছ কাঁচের উপর চোখ রাখলে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে হয় দর্শকদের। হাত দিয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে দর্শনীয় স্থান, কিংবা বিভিন্ন চিত্রকর্মের ছবি দেখানো হতো এই বায়োস্কোপে। গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় সব কাহিনী ও কাল্পনিক চিত্র দেখানো হতো বায়োস্কোপে।