চারঘাট আমার গর্ব

— গাজিবর রহমান

(নাট্য গবেষক)

***************************************************

উৎস: চারঘাট উপজেলার উত্তরে আছে পবা ও পুঠিয়া উপজেলা, পূর্বে নাটোর বাগাতিপাড়া উপজেলা, পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের মৃর্শিদাবাদ জেলা এবং দক্ষিণে বাঘা উপজেলা অবস্থিত । চারঘাট ২৪.২৭ ডিগ্রী উত্তর অক্ষাংশ হতে ২৫.৪৩ ডিগ্রী অক্ষাংশ এবং ৮৮.১৭ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশ হতে ৮৮.২৫ ডিগ্রী পূর্ব দ্রঘিমাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত । চারঘাট উপজেলা রাজশাহী জেলা সদর হতে ৩৪ কিলোমিটার পূর্ব দক্ষিণে পদ্মা এবং বড়াল নদীর তীরে অবস্থিত । চারঘাট প্রধানত খয়ের চাষের জন্য বিখ্যাত এছাড়া এখানে সুমিষ্ট ও সুঘ্রাণ নানান প্রজাতি আমের জন্যও প্রসিদ্ধ ।

চারঘাটের নামকরণ: চারঘাটের চারটি বড় বড় ঘাট ছিলো যেমন বাবুলালের ঘাট, বেদেপাড়ার ঘাট, ইস্টিমারের ঘাট আর ছিলো ঠাকুর বাড়ির ঘাট। এই চারটি ঘাটের সমন্বয়ে নামকরণ করা হয় “চারঘাট”।

ভৌগোলিক অবস্থা : চারঘাট উপজেলা সমতল ভুমি । প্রতি বছর পদ্মা ও নন্দকুজা বা বড়ালের পানি দুকুল প্লাবিত হয়ে চাষের জমিতে পলি মাটির উর্বতা ক্ষতা বাড়িয়ে দেয় এবং প্রাকৃতিক রূপ উপজেলাকে সুন্দর বিন্যাসে নব্যরূপে সাজিয়ে তুলে ।

আবহাওয়া : চারঘাট উপজেলার গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ৪৫ ইঞ্চি তবে, কিছুটা উঠানামা করে এবং চরম উষ্ণ আবহাওয়া । গ্রীষ্মকালের শুরু হয় এপ্রিল ও মে মাসের দিকে তখন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রী ফারেন হাইট এবং সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ৬৫ ডিগ্রী ফারেন হাইট থাকে ।

চারঘাটের অর্থনীতি : চারঘাট উপজেলার মানুষ চাষাবাদে কৃষি নির্ভরশীল তবে বেশীরভাগ লোক ব্যবসার উপর নির্ভরশীল।আবার অনেকে আছেন জেলে, তাঁতী । এখানে উল্লেখযোগ্য বানিজ্য সফল হলো আম ও আখ চাষ । কৃষকেরা বারোমাস ধানের চাষ করেন । এখানে সারা বছর খয়ের চাষীরা, খয়ের চাষে ব্যস্ত থাকে । চারঘাট মুলত খয়ের জন্য বিখ্যাত ।

চারঘাটের নদ-নদী: চারঘাট উপজেলার নিজস্ব অনেক ঐতিহ্য রয়েছে । হিমালয়ের গঙ্গেত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গা নদীর প্রধান শাখা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, এখান থেকে নদীটি পদ্মা নাম ধারন করে চারঘাট উপজেলার কোল ঘেঁষে কুলকুল রবে বহে চলেছে বাঘা উপজেলার দিকে । তারই শাখা নদী বড়াল বা নন্দকুজা । চারঘাট উপজেলায় আরও অনেক নদী কালের গর্ভে তলিয়ে গেছে যেমন : চন্দনা, খালিসিডিঙ্গা, মহানন্দা, গঙ্গামতি, নারদ, ঝিনি, ইছামতি, ছোট বড়াল, মুসা খান, ত্রিমহণী এইরূপ অনেক নদী লোপ পেয়েছে । চারঘাট উপজেলার বড়াল বা নন্দকুজার উৎসমুখে ১৯৮৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড স্লুইচ গেট নির্মাণ করেন । বর্ষাকালে স্লুইচ গেটটি খুলে দিলে বড়াল নদী কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় এবং নদীটির প্রখরতাও বেড়ে যায় অনেক। এই সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এসে ভীড় করে স্লুইচ গেটের উভয় পার্শ্বে উৎসব মুখর পরিবেশে ।

ক্যাডেট কলেজ: রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার সারদাতে পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত । ঔপনিবেশিক পাকিস্থান আমলে পূর্ব পাকিস্থানে প্রতিষ্ঠিত চতুর্থ তথা শেষ ক্যাডেট কলেজ রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ । পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৬৪ সালের ৬ই নভেম্বর “আয়ুব ক্যাডেট কলেজ” নামে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন । পুর্ব পাকিস্থানের গভর্নর মোনায়েম খান ১৯৬৬ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী আয়ুব ক্যাডেট কলেজের উদ্বোধন করেন । পদ্মা নদীর তীরে ১১০ একর জমির উপর তিনটি হোস্টেল নিয়ে এ ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় । প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন উইং কমান্ডার মোহাম্মদ সাঈদ, পিএএফ । কলেজের প্রথম বাঙালী অধ্যক্ষ এম বকীয়তুল্লাহ । বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আইয়ুব ক্যাডেট কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ রাখা হয় ।

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী: রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার সারদাতে ১৮৬১ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ইউনিফর্মধারী পুলিশের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় । এর ৩২ বছর পর পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করে তারপর নামকরণ হয় ট্রেনিং স্কুল ।স্কুল থেকে ট্রেনিং কলেজ। কলেজ থেকে আজকের একাডেমী ।

১৯১২ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয় । তৎকালিন ব্রিটিশ সরকার ১৮৯৩ সালে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন । এরপর ১৯০২ সালে মিলব্যারাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের অনুমতি দেয় । আর ১৯০৬ সালে ট্রেনিং স্কুলকে করা হয় ট্রেনিং কলেজ । অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ পান তৎকালিন ব্রিটিশ মেজর এইচ চ্যামেনি । অধ্যক্ষ চ্যামেনি ঢাকা থেকে স্টিমারে কলকাতায় যাবার পথে একাডেমীর স্থান অনুসন্ধানের জন্য রাজশাহীর পদ্মা নদীর তীরবর্তী চারঘাট উপজেলার সারদাতে থামেন । এখানকার মনোরম পরিবেশে বিশেষ করে বিশাল আম বাগান, সু-উচ্চু বড় বড় কড়ই গাছ ও প্রমত্তা পদ্মার বিশালতায় মুগ্ধহন তিনি এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রস্তাপ দেন । জায়গাটির মালিক ছিল মেদিনীপুরের জমিদার । ১৪২.৬৬ একর জমি ২৫ হাজার টাকায় কিনে নেন । তখন জায়গাটি ছিল ঘন জঙ্গলে ঠাসা এবং হিংস্র বাঘের উপদ্রব ছিল। লোকমুখে আছে এলাকায় বাঘের উপদ্রব থাকার কারণে বলা হতো, শেরদা এর অর্থ ছিল বাঘের গ্রাম। পরে শেরদা থেকে সারদা নামকরণ হয় ।

চারঘাটের আদি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠি: চারঘাট উপজেলায় হিন্দু, মুসলমানের পাশাপাশি এখানে কিছু সাঁওতাল, পাহাড়ীয়া ও তুরিরা বসবাস করে আসছে ।এদের বেশির ভাগ দেখা যায় চারঘাটের গঁওরা, নিমপাড়া, শলুয়া ঘোষপাড়া, পরানপুর, হ্যারিনি পাড়া ও বামনদীঘি সরদার পাড়া, কামনীগঙ্গারামপুর এদরে দেখা মিলে ।এরা বর্তমানে নিজেদের পরিচয় ভুলে গিয়ে হিন্দু পরিচয়ে পরিচিত হতেই বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করে । চারঘাট উপজেলায় সব মিলে মোট ৮৫২ জনের মত আদি-নৃগোষ্ঠি বসবাস করে । চারঘাট উপজেলায় বর্তমানে গড় শিক্ষিতের হার প্রায় ৬৪% ।

চারঘাট থানার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: চারঘাট মডেল থানা পদ্মা নদী ও পদ্মা নদীর শাখা নদী বড়ালের (নন্দকুজা) সংযোগস্থলে (মহনার) মাথা উঁচু করে অত্র এলাকার সেবা করে চলেছেন । ১৮৬৯ সালে প্রষ্ঠিত হয় । চারঘাট মডেল থানার জমির পরিমান ১ দশমিক ৮৫ একর । .১৪১ বর্গ কিলোমিটার । যাহা সরকারী নোটিফিকেশন নং ১৬৯৫, তারিখ : ১২/০৩/১৮৬৯ খ্রি: মূলে অধিগ্রহন করা হয় ।

চারঘাট পৌরসভা: চারঘাট পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ৯ জুলাই ১৯৯৮ সাল, তখন ছিল বর্ষাকাল । পদ্মা ছিল প্রমত্তা মৃদুমন্দ ঢেউ মনের খুশির বন্যা বয়। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে চারঘাট উপজেলার ৫ নং চারঘাট ইউনিয়নের ১০টি মৌজার ১৮.৭৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ৯টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে চারঘাট পৌরসভা।

চারঘাট সাংস্কৃতিক অঙ্গন: চারঘাটে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে – যেমন পদ্মা বড়াল থিয়েটার, প্রজন্ম থিয়েটার, কচিপাতা থিয়েটার, সবুজপাতা থিয়েটার, চারঘাট থিয়েটার, রেনেসাঁ সাহিত্য পরিষদ, চারঘাট কাচারাল ফোরাম, ললিত কলা, শাপলা সংঘ, বঙ্গবন্ধু আবৃত্তি পরিষদ, রংধনু শিল্পগোষ্ঠি, উদীচি শিল্প গোষ্ঠি, চারঘাট সঙ্গীত বিদ্যালয়, নজরুল সাহিত্য সংসদ এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন “পদ্মা বড়াল থিয়েটার” তদের মধ্যে অন্যতম ও সক্রিয়ভাবে জনসেবামুলককাজ ও জনসচেতনমুলক কাজ করে যাচ্ছে । পদ্মা বড়াল থিয়েটার বিনোদনের দিকদিয়েও অন্যতম ।এ সংগঠনটি ১৯৯০ সালে ২৩ আগস্ট চারঘাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে প্রথম আহবায়ক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় । বর্তমানে সংগঠনটি গবেষনামুলক বাংলা নাটক ও লোকপালার কার্যক্রম করে যাচ্ছে । যা ভবিষ্যৎ বাংলা নাটকের মান, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও পুর্ণতা লাভ করবে ।

চারঘাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য : স্বর্ণ প্রসবিনী চারঘাট উপজেলার সমতল ভুমি । এখানে প্রতিদিন পদ্মার পাড়ে ভীড় জমায় শত শত দর্শনার্থী । পদ্মার পাড় থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায় । যা কুয়াকাটার আদল । পদ্মার বুকে জেলেরা ভাটিয়ালী গান গেয়ে রূপালী ইলিশ ধরে । সাদা সাদা বকের সারি কাশবনের দুধারে ঋষি সেজে ধ্যানমগ্ন থাকে । পদ্মা ও বড়ালের সঙ্গমস্থলে দুপাশে সবুজ ঘন গাছগাছালি আর পাখ পাখালির গানে মুখরিত হয় সবুজ বনভূমি । এখানে আগে নন্দকুজার (বড়াল)বুকের উপর খেয়াঘাট ছিল । সেই খেয়াঘাটে ছিলো অনেকগুলো নৌকা সারাদিন হানিফ বাঙাল আর ভদু মাঝি খেয়া পারাপার করতো । রাতের বেলা ভদু মাঝি হাঁক দিয়ে হানিফ বাঙালকে সাবধান করে দিতো, বলতো “ও মাঝি ভাই যার যার ডাইনে গো” । ওরা ওপারের মানুষকে এপারে আনে আর এপারের মানুষকে ওপারে নিয়ে যায় যেন তারা দিনমান বিনা সুতোর মালা গাঁথে চলে । খেয়া পারাপারের পয়সা নিতো মুনারুদ্দিন বিশ্বাস ও আক্কাস পাগল সঙ্গে আরও অনেকেই ছিলো । এই নন্দকুজার বুকে আগে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে নৌকা বাইচ খেলা হতো ।

এখানে গৈগ্রামের বাঁশের ঝাড়ে এখনও চাঁদ উঠে । এখানে রাতের বেলা হুতুম পেঁচা, লক্ষীপেঁচা আর রাতচোরা পাখির বিরহের ডাক শোনা যায় । এখানে রাতের পহরে পহরে শেয়াল ডাকে । বর্ষায় ব্যাঙের ডাক আলাদা একটা সুর টানে । ঝিঁঝিপোকার একটানা গান আমাদের মুগ্ধ করে । এখানে বাড়ির আনাচে কানাচে কচুর পাতায় পানি টলমল করে ।

চারঘাট উপজেলা : চারঘাট উপজেলার আয়তন ১৬৪,৫২ বর্গ কিলোমিটার । সংসদীয় এলাকার নাম চারঘাট-বাঘা। নির্বাচনী এলাকা ৫৭, রাজশাহী-৬। সর্বমোট জনসংখ্যা ২,০৬,৭৮৮ জন । পুরুষ- ১,০৪,১৩৮ জন ও মহিলা- ১,০২,৬৫০ জন। এখানে ইউনিয়ন ৬টি যথা : ইউসুফপুর, শলুয়া, সারদা, নিমপাড়া, চারঘাট, ভায়ালক্ষীপুর । এখানে বর্তমানে – কলেজের সংখ্যা ১২টা । মাধ্যামিক স্কুলের সংখ্যা ৫৮টা। মাদ্রাসার সংখ্যা ১০টা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৩টা। কিন্ডার গার্ডেন ৫টি । মসজিদের সংখ্যা ৩৪১টি। মন্দিরের সংখ্যা ৩০টি। গীর্জার সংখ্যা ১টি । ক্ষুদ্র শিল্প ৪০টি । কুটির শিল্প ৪৫০টি । হাট বাজারের সংখ্যা ১৪টি । বালু মহল ৩টি । জল মহল ৩টি । মোট সড়কের সংখ্যা ২৩৩টি । মোট রাস্তার দৈর্ঘ্য ৪৬৩.৯৪ কিলো মিটার। পাকা রাস্তার দৈর্ঘ্য ১৬৫.১৫ কিলোমিটার ।

প্রকাশ- ১৭ পৌষ ১৪২৭ * ০১-০১-২০২১ * ঘুমঘর