বাঙালির সংস্কৃতি ও মেলা পত্তন

——- গাজিবর রহমান

(নাট্য গবেষক)

******************************

মেলা একটি বিশেষ্য পদ। মেলা একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ “সমাবেশ” বা  “মেলা”। মেলা শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘মিলন’। বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র প্রদর্শনী ও আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থাসহ পণ্য বিক্রয়ের জন্য যে লোক সমাবেশ ঘটে তাকে মেলা বলে। মেলার সূত্রপাত হয়, প্রাগঐতিহাসিক যুগে কোন স্থানে লোক সমাবেশ থেকে। পরবর্তীতে ধর্মীয় কারণে কোন পূর্ণ স্থান বা তীর্থস্থানে অথবা সিদ্ধি ব্যক্তির স্মরণে যে ধর্মীয় সমাবেশ হতো, সেই সমস্ত সমাবেশ থেকেই মেলার উৎপত্তি। তবে সাধারণভাবে মেলা ঋতুভিত্তিক হয়ে থাকে। ফলে ঋতু অনুযায়ী মেলা সংগঠনের সংখ্যা নির্ধারিত হয় যা কৃষিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় উৎপাদনের সাথে জড়িত। মেলার বিশেষত্ব এবং সময় ও সংগঠন মেলার চতুপার্শ্বের উৎপাদন এলাকার উৎপাদনের বিভিন্নতা আলোকপাত করে। ঋতুভিত্তিক কেনা-বেচার জন্য মেলার কার্যক্রমে প্রায়ই স্থানীয় কৃষি ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় যা বিভিন্ন ঋতু ও জলবায়ুর সাথে সম্পৃক্ত। এই ধরনের মেলার স্থিতিকাল প্রধানত ঋতুভিত্তিক যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সময়ে বিভক্ত থাকে এবং বিশেষ উৎপাদন বা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড প্রাধান্য পায়।

বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস বহু পুরনো। বাঙালির সংস্কৃতি ও মেলা পত্তন প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো। এই সংস্কৃতির রয়েছে বহুমাত্রিক ধারা। বাঙালি দর্শন, সাহিত্য,  সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রথা, উৎসব খুবই সমৃদ্ধ। বাঙালি সংস্কৃতির মধ্য রয়েছে দর্শন, সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য, খাবার, পোশাক, শিল্প, নন্দনতত্ত্ব, কাব্য, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, উৎসব, খেলাধুলা, গণমাধ্যম পারিবারিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি। বাংলা অঞ্চলে বর্তমানে সাতটি অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এসবের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী বাউল সংগীত, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নববর্ষ, দুর্গাপূজা ও ইসলামী মূল্যবোধ অন্যতম। বাঙালির সংস্কৃতির প্রাণ হলো লোকসংস্কৃতি। এ লোকসংস্কৃতির ভিত্তিমূলে রয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান হলো মরমী গান ও নবান্ন উৎসব। পরবর্তীতে নগর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে থাকে। তবে নগর সংস্কৃতি যতই অগ্রগামী হোক না কেন বাঙালি সংস্কৃতির পরিমাপক সব সময় গ্রামীণ সমাজ। কৃষি জীবন ও নদ-নদী বাংলার সংস্কৃতিকে নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গ্রাম বাংলা সংস্কৃতির উৎস । লোক দর্শন, লোকশিল্প, লোকবিশ্বাস, সম্প্রীতি,  গ্রামীণ পালা পার্বণ, সহ-অবস্থান, সৌহার্দ,  বঙ্গ লোকাচার, প্রবল জীবন প্রবাহ, প্রতিবাদী চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবিকতা বাঙালি সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, বাঙালি সংস্কৃতি অনেকটাই ধর্ম নিয়ন্ত্রিত। সনাতন ধর্ম ও ইসলামী মূল্যবোধে আচ্ছাদিত বাঙ্গালী সংস্কৃতির ধাঁচ। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ,  মঙ্গল শোভাযাত্রা,  পীর দরবেশদের দরগায় মানত বন্দনা,  ভক্তি,  সমর্পণ ইত্যাদি ধর্মীয় অনুশাসনের সিদ্ধ। বাঙালি সংস্কৃতিতে পোশাক অনন্য ভূমিকা পালন করে। এখানে ধর্মীয় প্রভাব দেখা যায়। ধুতি,  লুঙ্গি,  চাদর,   গামছা, ফতুয়া,  পাঞ্জাবি,  শাড়ী বাঙালি পোশাকী ঐতিহ্য। বিভিন্ন খেলাধুলায় বাঙালি সংস্কৃতি ছাপ স্পষ্ট। নৌকা বাইচ, লাঠি খেলা, কুস্তি, হাডুডু, লুকোচুরি গোল্লাছুট, ছি বুড়ি, বদন, কিত কিত খেলা, কানামাছি ভোঁ ভোঁ, ইত্যাদি বাঙালি সংস্কৃতি নিদর্শন। বাঙালি সংস্কৃতি গ্রামীণ প্রধান হওয়ায় এবং কৃষিভিত্তিক হওয়ায় এখানে প্রচলিত হয়েছে বিভিন্ন রসালো ধাঁ ধাঁ, প্রবাদ,  প্রবচন,  মরমী সংগীত, কবি গান, মানব বন্দনা। লোকসংস্কৃতির ভেতর দিয়েই বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান মিলে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর ঋত্মিক। লোকসংস্কৃতি নানা উপাদান নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ব্রতচারী আন্দোলন। দীনেশ চন্দ্র সেন, চন্দ্র কুমার দে, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, কবি জসীমউদ্দীন, আশুতোষ ভট্টাচার্য বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতির সত্তার স্বরূপ উদঘাটনে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। বাউল সম্প্রদায়ের অনবদ্য কৃর্তি বাঙালি সংস্কৃতি উন্নয়নে মহিরুহু হিসেবে কাজ করেছে।

সরলতা, প্রেম, দয়া, দানশীলতা, সহনশীলতা, আতিথেয়তা, মরমে চেতনা, প্রকৃতিকতা বাঙালি সংস্কৃতি এক দ্রৌপদী ধারা। একটি বিষয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাউল দর্শন, বৌদ্ধ দর্শন, হিন্দু দর্শন, বাঙালি সংস্কৃতির পিলার বা স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। মধ্যযুগে ইসলামের আগমনের ফলে সুখী দর্শন বিকশিত হতে থাকে যেটা মরমী চেতনায় সমৃদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সুফিবাদ বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। রামকৃষ্ণ, শ্রী চৈতন্য,  মহা প্রভু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বুদ্ধ দার্শনিক শান্ত দেব, মহাবীর,  শ্রীধর ভট্ট, সুফি সাধক শাহজালাল, বড়পীর, সৈয়দ আহমেদ শেরওয়ানি বাঙালি সংস্কৃতির মহিরুহু হিসেবে অবদান রেখেছেন।বাঙালি সংস্কৃতি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পহেলা বৈশাখ। বাঙালির পহেলা বৈশাখ হল মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতীক, একত্বের প্রতীক সমতার প্রতীক, ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতির প্রতীক। বৈশাখ বছরে একবার আসে কিন্তু এটি সারা বছরের গণ-আনন্দকে তরান্বিত করে। বৈশাখী মেলার নাগরদোলাতে ছেলে-বুড়ো, নর-নারী, আবাল-বৃদ্ধ,  যুবক-যুবতি,  কিশোর-কিশোরী, আপামর সকল জনসাধারণ হিন্দু, মুসলিম, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ সকল জাতি মিলে মিশে একই নাগর দোলায় আমরা একই উৎসব একই সঙ্গে পালন করে যাই।  বৈশাখের সাহিত্য মূল্য বহুমাত্রিক। বৈশাখ নিয়ে রচিত কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, গল্প, নাটক, গান বাংলা সাহিত্যের একটি ক্রনিক সংযোজন। সংঘ বাংলায় বৈশাখী মেলা ভ্রাতৃত্বের এক নব ব্যঞ্জনা তৈরি করে। বৈশাখ আমাদের সবার গৌরব। কোন ধরনের হীন স্বার্থে আমরা যেন এর গায়ে কলঙ্ক না লাগায়।

মেলা শুরুর সঠিক সময় কেউই জানে না বা এ নিয়ে মতভেদ আছে। তবে জানা যায় প্রায় চারশত বছর পূর্বে মরা বাঙালি নদীর জলে প্রতিবছর মাঘের শেষ বুধবারে অলৌকিকভাবে এক বিশাল কাতল মাছ জেগে উঠে এবং তার পিঠে সোনার ঝুড়ির মতো দেখতে পাওয়া যায়। এরপর থেকেই প্রতিবছর ঠিক এই সময়টাই এই দৃশ্য দেখার জন্য গ্রামবাসীরা জড়ো হতে থাকে। এ সময় এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে এই মেলা সংগঠনের স্থানে প্রাচীন এক বটগাছের নিচে। যিনি এই মাছের নিকট অর্ঘ্য নিবেদন করেন এবং একসময় এখানে আশ্রম গড়ে ওঠে এবং সন্ন্যাসী পূজার আবির্ভাব হয়। এসময় ধীরে ধীরে লোক সমাগম বাড়তে থাকে যার ফলে একসময় এই মেলার গোড়াপত্তন হয়। সেই থেকেই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মেলায় মানুষজন জড়ো হয়ে বেচাবিক্রির মাধ্যমে মেলাটি আজকের অবস্থায় আসে।

মেলা বাংলাদেশের অলৌকিক ও জনপ্রিয় উৎসব। এদেশে মেলার উৎপত্তি হয়েছে মূলত গ্রাম-সংস্কৃতি হতে। তবে কবে কিভাবে এদেশে মেলার উৎপত্তি হয়েছে তা সঠিক করে বলার উপায় নেই । গবেষকদের মতে, বাংলায় নানা ধরনের ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান ও উৎসবের সূত্র ধরেই মেলার উৎপত্তি হয়েছে। সে দিক দিয়েই এদেশের মেলার প্রাচীনত্ত হাজার বছরেরও অধিক পুরনো।

মেলার সময় নির্ধারণ করা অত্যন্ত জটিল ব্যাপার। কারণ মেলার সূত্রপাত অনুযায়ী বিভিন্ন মেলা বৎসরের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। তবে সাধারণভাবে মেলা ঋতুভিত্তিক হয়ে থাকে।

মেলা বাঙ্গালীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। চৈত্র মাস এলেই আমাদের মনটা কেমন যেন মনে হয়। মনে পড়ে, সেইসব-শৈশব ধূসর রুদ্র মাখা দিনগুলোর কথা। আমার মনে পড়ে যায় প্রিয় গ্রামের কথা । গ্রামের হাট-বাজারের কথা। সেই পালানাট্য, যাত্রাপালা, নাগরদোলা আর নানা রকম সব বিচিত্র মেলার কথা।

বাঙালি উৎসবমুখর জাতি। বাঙালি অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। আর তাই বাঙালির যেকোনো উৎসবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনতার ঢল নামে মেলা উৎসবে। বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্র সম্প্রদায়ের সবার অংশগ্রহণে এখানে মেলার অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বছরের নানা সময়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে উৎসব কেন্দ্রে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেলা বাঙালির লোক ঐতিহ্যের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হলেও নির্দিষ্ট কিছু মেলা জাতির কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছে। বাঙালি সংস্কৃতির ধারাকে বহমান রাখে মেলা আর তাই বহমান থাকে লোকসংস্কৃতি । মেলার দুটি দিক সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক। মেলাকে ঘিরে যে আয়োজন তা বহুধা বিস্তৃত এবং বর্ণাঢ্যতায় ভরা শিকড়ের এসব বিনোদন যুগ যুগ ধরে আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। সময়ের ও কালের বিবর্তনে মেলা ও মেলা কেন্দ্রীক উৎসব এখন অনেক বদলে গেছে।

বছরের নানা সময়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে উৎসব কেন্দ্রিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মেলা বাঙ্গালির লোকঐতিহ্যের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ হলেও নির্দিষ্ট কিছু মেলা জাতির কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অন্যতম ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ প্রথম মেলার প্রচলন কবে, কোথায় হয়েছিল তা জানা না গেলেও মেলা যে আবহমান বাংলার এক প্রাচীন ঐতিহ্য এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। বিভিন্ন গবেষকরা মনে করেন, গ্রামীণ হাট-ই মেলার আদিরূপ। অতীতে রাজা, জমিদারেরা মেলার আয়োজন এবং পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সাধারণত ধর্মীয় উৎসব ঘিরেই মেলা বস্তু তৎকালীন সময়ে। আর এখন মেলার সেই রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয়, মেলা পাশে বাঙালির সাংস্কৃতিকক্ষেত্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। ধর্মীয় চেতনার বাইরে অন্যান্য সামাজিক বা লৌকিক আচরণগুলো যুক্ত হয় মেলার সঙ্গে। বাঙালির মেলার যেমন রকম ফেরা রয়েছে তেমনি ভাবে মেলার চারিত্র্যও পৃথক। তবে এসব মেলার সঙ্গে যে বাঙালির নাড়ির যোগসূত্র রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে নানান রঙের মেলা। এসব মেলার পৃথক চারিত্রিও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রঙ্গে আর ঢঙ্গে। তাছাড়া বিগত দিনে লোকসংস্কৃতি আশ্রয়ী যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি পরিবেশন করা হতো। এখন আধুনিক ফর্মে পরিবেশিত হচ্ছে। বলা যেতে পারে বাঙালির প্রকৃত জীবনেতিহাস অতীতের সঙ্গেই নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য। যে কারণে বাঙালির আত্মানুসন্ধানের জন্য ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতির উৎসবের স্মরণাপন্ন হতে হয়। মূলত এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাঙালি ঐতিহ্যের উন্মেষ ঘটে অতীত থেকে। বিবর্তিত জীবনধারায় লৌকিক এ ধারাটি এখনো প্রবাহমান আর এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই বাঙালির আত্মপরিচয়ের মূল মন্ত্র নিহিত। সেদিক দিয়ে বাংলাদেশের মেলার প্রাচীনত্ব হাজার বছরেরও অধিক পূরনো। এদেশের প্রাচীন পর্যায়ের উৎসব ও কৃত্যানুষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলাগুলোর মধ্যে প্রথমে আসে জীবনধারণের আহার্য  কৃষিশস্য এবং বিশেষ করে কৃষির সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত রোদ ও মেঘের কথা । রোদ মানে সূর্য। সে কারণেই বলা হয়েছে পার্বনের দেশ বাংলাদেশ।

প্রাচীন বাংলার মানুষ চাঁদ ও সূর্যকে “বুড়া -বুড়ি” নামে যেখানে পূজা করেছে , সেখানে পূজা উৎসবে পূজারীরা সমবেত হতে থাকলে একসময় ধীরে ধীরে “বুড়া-বুড়ির মেলা” প্রবর্তিত হয়। এর সঙ্গে আসে মেঘের জন্য বরণ বা বারণী। উল্লেখ্য বুড়া-বুড়ির মেলাটি পরে সূর্যমেলা, সূর্য ঠাকুরের ব্রত, চৈত্র সংক্রান্তির ব্রতের মেলা, চড়ক মেলা, শিবের গাজনের মেলায় রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে মেঘের দেবতা বরুণ ও বারণীস্নানের মেলা হিসেবে রূপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে প্রচলিত প্রতিটি মেলা আয়োজনের পিছনে কোন না কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। সেটি হয় ধর্মীয়, নয়তো ব্রত-পালা-পার্বণ অথবা যে কোন একটি নির্ধারিত বিষয় বা ঐতিহ্যকে স্মরণ করে। উল্লেখ্য, একটি জায়গায় অনেক লোকের সমাবেশ ও সমাগম মানেই সাধারণ বাংলা অর্থে মেলা বলা হয়। মেলা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করতে হবে । মেলা মানেই আগামী প্রজন্মের বিকাশ ও মাইল ফলক।

বৈষয়িক, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনীতি, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, নৈতিক-সকল ক্ষেত্রেই দুর্দশা আর ভাঙ্গনের হাহাকার প্রবলতর হচ্ছে ক্রমাগত। কৃষি নির্ভর যৌথ সামাজিক জীবনে আজ নৈরাশ্যের আঁধার। সকল স্তরে মানুষের বসবাসে সমৃদ্ধ নিউক্লিয়াস বসতগ্রাম ও যৌথ পারিবারিক বন্ধন এখন ছিন্নভিন্ন, একাকার। এককভাবে বেঁচে থাকার অশুভ প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে সমোন্নতি সুস্থ চেতনা আর প্রাণোচ্ছল ঐক্যবদ্ধ। তবুও নানা কষ্ট ও দুর্দশা কাল অতিক্রম করেও বাঙালি তার সতেজ, সহজ, সজিব মানসিকতার পরিচয় রাখে প্রচলিত নানাবিধ উৎসব কলার মধ্যে। অল্প কালের জন্য হলেও পরস্পর যেন মিলিত হয় পারিবারিক বন্ধনে। যেদিন এ জাতি তার এই উৎসব প্রিয় মনটিকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে সেদিন তার জাতিসত্তা তথা জাতিগত বৈশিষ্ট্য লোপ পাবে-এ বিষয়ে সন্দেহ নেই বলে ধারণা করা যৌক্তিক। তাই সকল সীমাবদ্ধতা সত্বেও এই সহজ সজীবতার উদ্ধার, লালন, পৃষ্ঠপোষণ ও জাগরণ নিয়ে কাজ করা জরুরী। আমাদের অমনোযোগ ও অবহেলা-অনীহা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যেন ঐতিহ্যহীনতা অন্ধকার প্রসারিত না করে।

সংস্কৃতি প্রবাহমান নদীর মত – এ রূপান্তর আছে, মৃত্যু নেই। মানুষের জীবনচর্চা ও চর্যার বৈচিত্র্যময় সমন্বিত রুপই সংস্কৃতি। সামাজিক মানুষের জীবন যাপন- পদ্ধতি, ধারাবাহিক ঐতিহ্য, প্রজন্ম-পরস্পরা, আচার-বিশ্বাস-প্রথা, ভূয়োদর্শন, ভাব-ভাবনা, নীতি-নৈতিকতা, উৎপাদন-উদ্ভাবন এই সবই সংস্কৃতির মূল উপকরণ।

সাংস্কৃতির পরিসর-পরিধি বিশাল ও ব্যাপক। তাই কোন একটি নির্দিষ্ট ছকে-বাঁধা সংঙ্গা-সূত্রে একে সীমাবদ্ধ করা চলে না। দেশ-কাল-ভাষা-ধর্মভেদে সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত। বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি ও এসব রূপ বৈশিষ্ট্যের সমবায়ী মৌচাক। এর সাথে সাথে বহুবিধ মেলার গোড়া পত্তন করেছেন। বিশাল বাংলার যে গ্রামকে নিয়ে আমাদের সংস্কৃতি, সভ্যতা, আমাদের স্মৃতি-স্বপ্ন, গৌরব, ঐতিহ্য আমাদের ইতিহাস – তা কি আবিষ্কারের মাধ্যমেই আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ উন্মোচিত হবে। সে-ই হবে বিস্তৃত-বিভ্রান্ত বাঙালির সত্যিকারের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’।

লোকায়ত বাংলার চিরায়ত রূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এক এক সময় এক এক বিদেশী শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে শাসন করেছে বঙ্গ নামে দেশটি। এদের মধ্যে আর্য-অনার্য, পাল, মুঘল, পাঠান, হিন্দোল ও ইংরেজ বেনিয়ারা অন্যতম। তাদের শিল্প-সংস্কৃতির মিশ্রণে আরো সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতির রূপ । হাজার হাজার নদী বিধৌত ৬৮ হাজার গ্রাম নিয়ে আমাদের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ঐতিহাসিকদের মতে এই জনপদে নানা শ্রেণী-পেশা ও ধর্মের মানুষের সহাবস্থান দীর্ঘদিনের । এদের পরস্পরের মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন। আবার প্রতিটি ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতি থাকলেও সর্বোপরি বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। আমাদের স্বাধীন ভূখণ্ডের গ্রামীণ জীবনে রয়েছে নানা ধরনের উৎসব ও পার্বণ। এই লোকজ অনুষ্ঠানগুলো বাঙালির প্রাণের উৎসব। যা হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরম্পরায় পালিত হয়ে আসছে। এই উৎসবগুলো মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি ও আমাদের সংস্কৃতি বাঙালিয়ানা । এর শিকড়ে শিকড়ে রয়েছে মেলার পত্তন।

*** বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা : বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরীতে (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর লাইব্রেরী)। এটি ছিল মূলত শিশু গ্রন্থ মেলা যার আয়োজন করেছিলেন কথা সাহিত্যিক সরদার জয়েন উদ্দীন । তিনি একসময় বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতে। এরপর আরো বড় আয়োজনে গ্রন্থমেলা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন তিনি।

১৯৭০ সালের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন তিনি। এই মেলায় আলোচনা সভারও ব্যবস্থা ছিল তাতে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাই, শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম।

বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলার ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের মতোই পুরনো। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই বাংলা একাডেমিতে একুশের অনুষ্ঠানে কোন বই মেলা হয়নি। তখন একাডেমীর দেয়ালের বাইরে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতি প্রকাশনীর কিছু বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন ১৯৭২ সালে।

১৯৭২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্তমান হাউস প্রাঙ্গনে বটতলায় চটের উপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন  করেন। এ ৩২ টি বই ছিল চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমান মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লিখা। ওই সময় বর্ণ মিছিল সহ আরো সাত-আটজন প্রকাশক একাডেমির ভিতরে পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে বই সাজিয়ে বসেন। এই হল বইমেলার ইতিকথা।

*** চারঘাট বৈশাখী কালু পীরের মেলা : রাজশাহী শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণে চারঘাট উপজেলা সদরে শিবলী চত্বরে বড়াল নদীর তীরে প্রতিবছর  বৈশাখ মাসে প্রতি বৃহস্পতিবারে এই বৈশাখী কালু পীরের মেলা বসে। শত শত বছর থেকে চলে আসছে এই বৈশাখী কালু পীরের মেলার আসর । তবে, বর্তমানে সপ্তাহে প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এই দুইদিন মেলা বসে। এই মেলায় সকল বয়সী লোকজনদের সমাগম হয়।

তবে, এখানকার স্থানীয় বয়স্ক লোকজনদের বেশ কিছু কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।  কথিত আছে যে, কালু নামের এক সন্ন্যাসী তাঁর আধ্যাত্মিকতার জন্য বেশ প্রসিদ্ধ ছিলেন আর পীর উপাধি পেয়েছিলেন। (তবে এটি কালু গাজী চম্পাবতীর কালু পীর নয়) তিনি একখণ্ড কালো পাথরের উপর দাঁড়িয়ে গঙ্গা পার হয়ে চারঘাট এর প্রাচীনতম চন্দন শহর, কিজ্জম পুর ও প্রভৃতি গ্রামে আসতেন ও ধর্ম প্রচার করতেন। এখন আর কিজ্জমপুর নেই, সেই গ্রামটি আজ পদ্মার গর্ভে তলিয়ে গেছে অনেক আগেই। কালু পীরের আগমন উপলক্ষে ও তাঁর খ্যাতির কারণে ভক্তরা ভিড় জমাত। কালু পীরের খ্যাতির কারণে মেলার নাম ডাক চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তখন দুই বাংলার অনেক লোকের সমাগম হতে থাকে মেলায়। অনেকে অনেক সদায় নিয়ে আসতেন। আস্তে আস্তে তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে মেলার আসর বসতে শুরু করে। ইতিহাস সেটাই বৈশাখী কালো পীরের মেলায় হিসেবে পরিচিত পায়।

এই মেলাকে উপলক্ষ্য করে সার্কাস, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ আরো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী ও শিশুদের খেলনা বিক্রি হয়। নৌকা যোগে দূর-দূরান্ত থেকে লোক আসতো। বড় বড় জাহাজে করে পণ্য নিয়ে আসতো বজরায় আসতো জমিদার জোরদারের পরিবারের সদস্যরা। তবে বৈশাখী কালু পীরের এই মেলাটি জায়গার অভাবে বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে থাকে।

“মেলা” মানে মিলন ক্ষেত্র। সকল সমাজবদ্ধ মানুষের মিলনের উৎস স্থল হিসেবে মেলার প্রয়োজনীয়তা সমাজ জীবনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরে সমাজবাসী মানুষের কাছে তেমন আকর্ষণীয় নয়। কারণ মেলার সঙ্গে তাদের হৃদয়ের কোন সংযোগ থাকে না। শহরের মেলায় তাই শহুরে কৃত্রিমতা লক্ষণীয়। নেহাত প্রয়োজন হলে তবেই শহরের মানুষ মেলায় আসে। কিছু কাজ নেই, সময় কাটছে না, চলো মেলা দেখে আসি। এই ভাব নিয়ে মেলায় যায়। আবার গ্রামীণ সামাজিক মেলার প্রতি শহরবাসী মানুষের বহু আকাঙ্ক্ষিত ও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বস্তু। আর গ্রাম্য সামাজিক মানুষের কাছে এক বিরাট উৎসব। অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের উত্তাপ দিয়ে এক একটি গ্রামের মেলা গড়ে ওঠে। মেলার সঙ্গে সমাজের থাকে নিবিড় সংযোগ। সামাজিক জীবনে প্রায় মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। মেলা সমাজবদ্ধ মানুষকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। সমাজ জীবনে মেলার সবচেয়ে বড় অবদান আনন্দদান। বর্তমান সমাজ জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ এই যে, নির্মল সংস্কৃতির মূলক আনন্দলাভের উপলক্ষ বা উপকরণের বড়ই অভাব। সারাদিন নানা কাজে ব্যস্ত থাকে মানুষ, তারপর ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরে নিষ্ক্রিয়তায় ও নিরানন্দে নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হয়। মেলায় গিয়ে সমাজ জীবনে বৈচিত্রের সঞ্চার করে। নিরানন্দ গদে বাঁধা জীবনকে আবেগে আপ্লুত করে। আনন্দের জোয়ারে মথিত এবং আলোড়িত করে। সমাজ জীবনে তাই মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। মেলায় মিলিয়ে দেয় মানুষে মানুষে, জিনিসে জিনিসে, দেশে দেশে। মেলা আবার ছিনিয়েও দেয় শিল্প-সংস্কৃতি সমাজকে। তবে মেলা যেমন নানান জাতি তার পৃষ্ঠপুষকরাও তেমনি আবার নানান প্রবণতায় হয়ে থাকে। এই মিলন মেলা থেকে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভাতৃত্ব, ঐক্য, শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার বন্ধন সুহৃদ হয়ে থাকে । এই সমাবেশ বিনোদন ও আনন্দেরও বটে। বাংলাদেশের মেলা হচ্ছে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সভ্যতা ও উৎসবের বহুমাত্রিক ধারার এক মোহনাস্থল। জিজ্ঞাসু মানুষদের অভাব অভিযোগ যত বাড়বে, যতই দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা তাদের শৃঙ্খলিত করবে, ততই মেলার জনপ্রিয়তা বাড়বে, ততই সেখানকার উদার উন্মুক্ত পরিবেশ তাঁরা খুঁজে পেতে চাইবেন মুক্তির স্বাদ।

*** বৈশাখী মেলা : বৈশাখী মেলা মূলত সার্বজনীন লোকজ মেলা। বাংলা নতুন বছরের শুরুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে উৎসব মুখর করে তুলে এই বৈশাখী মেলা। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্প জাত পণ্য, কুটির শিল্প জাত সব প্রকার হস্তশিল্প জাত ও মৃৎ শিল্প জাত এই মেলার মূল আকর্ষণ। এছাড়াও এ মেলাতে নাটক, যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস ও নাগরদোলা বিভিন্ন আনন্দ উৎসবমুখর আয়োজন থাকে।

***কুড়িখাই মেলা: কিশোরগঞ্জের কোটিয়াদীতে জমে উঠে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী কুড়িখাই মেলা। উপজেলার কুমড়দিয়া ইউনিয়নে কুড়িখাই গ্রামে বসে এই মেলা। প্রতিবছর মাঘের শেষ মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া মেলাটির স্থায়িত্ব এক সপ্তাহ। উজান-ভাটির মানুষের কাছে এই মেলা বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম।

স্থানীয়রা জানান, হযরত শাহজালাল (রহ) এর সফর সঙ্গীদের একজন ছিলেন হযরত শাহ শামছুদ্দিন বুখারী (রহ) । ১২২৫ সালে তিনি তাঁর তিন সঙ্গী শাহ নাসির, শাহ কবীর ও শাহ কলন্দরকে নিয়ে কুড়িখাই আসেন। এই জনপদে তার আসার কারণ ইসলাম প্রচার। মূলত তার মৃত্যুর পর ভক্তরা মাজার প্রতিষ্ঠা করেন। এক পর্যায়ে মাজার ঘিরে বছরের নির্দিষ্ট একটি মাসের নির্দিষ্ট বার শুরু হয় ওরস। মূলত ৪০০ বছর আগে থেকেই ওরস ঘিরে মাজারের চারপাশের শুরু হয় মেলা। আর এই মেলা উপলক্ষে গ্রামের জামাইদের দাওয়াত দিয়ে আদর আপ্যায়ন করা এখানকার রীতি। সেই সুবাদে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে গ্রামের মেয়েরাও।

এ মেলার প্রধান আকর্ষণ হল মাছ। বিক্রেতারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে মেলায় আনেন। কুড়িখাই গ্রামের জামাইদের এ মেলা থেকে মাছ কিনে শশুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়া রীতিতে পরিণত হয়েছে। ফেরার সময়ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মাছ কিনে দেন জামাইকে। এছাড়াও পাওয়া যায় আসবাবপত্র, শিশুদের খেলনা,  দৈনন্দিন পণ্য সামগ্রী, প্রসাধনী, মুড়ি-মুড়কিসহ বহু কিছু।

*** পোড়াদহ মেলা : বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রাচীন লোকজ মেলা। বগুড়া জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ইছামতি নদীর তীরে পোড়াদহ নামক স্থানে প্রতিবছর যে মেলা বসে তাই পোড়াদহ মেলা নামে পরিচিত। সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে মেলাটি শুরু হয়েছিল তাই এর নাম প্রথম অবস্থায় ছিল সন্ন্যাসী মেলা। মেলাটি পোড়াদহ নামক স্থানে সংগঠিত হয় বলে লোকোমুখে স্থানের নাম অনুসারে পোড়াদহ মেলা হিসেবে চলতে চলতে এক সময় এর নাম পোড়াদহ মেলা হিসেবে প্রচলিত হয়ে যায়।

বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে কোন এক সময় মেলা সংগঠনের স্থানে একটি বট বৃক্ষ ছিল। একদিন হঠাৎ করে সেখানে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয়। তারপর সেখানে দলে দলে সন্ন্যাসীরা এসে একটি আশ্রম তৈরি করে। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে সেটি একটি পূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সেখানে প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ দিনের কাছের বুধবার সন্ন্যাসী পূজার আয়োজন করে। দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা প্রতিবছর সেই দিনটিতে এসে সমাগত হতে থাকে। দিন গড়ানোর সাথে সাথেই প্রতিবছর লোক সমাগম বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে পূজার দিনটিতে একটি গ্রাম্য মেলার গোড়া পত্তন হয়। একসময় সন্ন্যাসীরা স্থানটি ত্যাগ করে চলে গেলেও সন্ন্যাসী পূজাটি অব্যাহত থাকে। ধীরে ধীরে মেলাটির পরিচিতি বাড়তে থাকে এবং দূর-দূরান্ত থেকে মেলা দেখতে লোকজন আসে। পূজা পার্বণ মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও মেলাটি ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সব ধর্মের মানুষকে উৎসবে একত্র করে এবং অদ্যাবধি কাল পর্যন্ত এটি সকল ধর্মের হাজার হাজার মানুষের এক বিশাল জনসমাগম। এখনো সন্ন্যাসী পূজাটি চালু রয়েছে।

*** কেল্লাপোষী মেলা : বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় গত পাঁচ শতাব্দি ধরে প্রতিবছরের জৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময়ে উৎসবে মেতে ওঠে এই অঞ্চলের মানুষ। আর এই উৎসবের উপলক্ষ্য ৪৫৯ বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী কেল্লা পোষী মেলা। স্থানীয়দের ভাষায় যাকে জামাই বরণ মেলাও বলা হয়ে থাকে। কেল্লা পোষী মেলা সম্পর্কে তেমনি একটি লোকগাঁথার কথা জানা যায়। ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ মেলা হয়ে আসছে বলে কথিত আছে। এ সম্পর্কে জানা যায়, বৈরাগ নগরের বাদশা সেকেন্দারের একজন ঔরসজাত এবং একজন দত্ত্বক ছেলে ছিলেন। ঔরসজাত ছেলের নাম ছিল গাজী মিয়া আর দত্তক ছেলের নাম কালু মিয়া। গাজী মিয়া দেখতে খুবই সুদর্শন ছিলেন। তারা রাজ্যের মায়া ত্যাগ করে ফকির সন্ন্যাসীর বেশ ধারণ করে ঘুরতে ঘুরতে ব্রাহ্মণ নগরে চলে আসেন। সেখানে ব্রাহ্মণ রাজ মুকুটের একমাত্র কন্যা চম্পাবতী গাজীকে দেখে মুগ্ধ হন। এক পর্যায়ে তারা দু,জন দু,জনকে ভালোবেসে ফেলেন। পালিত ভাই কালু মিয়া বিষয়টি জানতে পেরে গাজীর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে মুকুট রাজার নিকট যান। মুকুট রাজা ফকির বেশে যুবকের এইরূপ স্পর্ধা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে বন্দী করেন। এতে গাজী মিয়া কঠিন আঘাত পান। তিনি মুকুট রাজার নিকট থেকে ভাই কালু মিয়াকে উদ্ধারের জন্য কেল্লাপোষী নামক স্থানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন। পরে রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করে ভাই কালুকে উদ্ধার করেন এবং তার কন্যা চম্পাবতীকে বিয়ে করেন। আর তিথি অনুযায়ী ওই দিনটি ছিল জৈষ্ঠের দ্বিতীয় রোববার। ওই সময় গাজীর বিয়ে উপলক্ষে কেল্লা পুষী দুর্গে নিশান উড়িয়ে  তিনদিনব্যাপী আনন্দ উৎসব চলে এবং সেখানে মাজার গড়ে তোলা হয়। মেলা চলাকালে সেখানে ভক্তরা আসর বসায়। ঐ দিনগুলোকে অম্লান করে রাখতে প্রতিবছর তিনদিনব্যাপী এ মেলা বসে।

*** লোক ও কারুশিল্প  মেলা : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে প্রতিবছর মাসব্যাপী বসে লোক কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে প্রতিবছর এ মেলা শুরু হয় জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এ লোকজ মেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকার সব রকম গ্লুকোজ সংস্কৃতি ও কুটির শিল্প সামনে নিয়ে উপস্থিত হন শিল্পীরা।

*** দুবলার চরের এ রাস মেলা : পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবনের দুবলার চরে প্রতিবছর কার্তিক-অগ্রহায়নের পূর্ণিমা তিথিতে বসে রাস মেলা। অনেক হিন্দু পুন্যার্থী আর পর্যটক এ উৎসবে শামিল হতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসেন। এ উপলক্ষে পাঁচ দিনের একটি মেলা বসে দুবলার চরে। মেলাটির চলে আসছে ১৯২৩ সাল থেকে।

*** নাঙ্গল বন্দের মেলা : নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নাঙ্গল বন্দের ব্রহ্মপুত্র নদী সনাতন ধর্মাবলম্বীরা চৈত্র মাসে শুক্লাষ্টমী বা অশোকাষ্টমী তিথিতে পুণ্যস্নানের জন্য সমবেত হন। এ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী মেলা বসে ব্রহ্মপুত্রের দুই তীরে।

*** রাস লীলার মেলা : মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী ২ উপজেলা কমলগঞ্জ আর আদমপুরে কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব রাস লীলা। এ উপলক্ষে তিন দিনের মেলা বসে কমলগঞ্জের মাধবপুর ও আদমপুর এর সনাঠাকুর মন্ডপ এলাকায়।

*** রথের মেলা : সাধারণত বাংলা বছরের আষাঢ় মাসের শেষ সাপ্তাহিক বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রথের মেলা বসে। সবচেয়ে বড় রথের মেলা বসে সাভারের ধামরাইয়ে। এছাড়া কুষ্টিয়ার রথ খোলার মেলা, রাজশাহীর পুঠিয়ার রথের মেলা, সিলেটের লামাপাড়া রথযাত্রার মেলা, বগুড়ার রথ মেলা উল্লেখযোগ্য।

*** লালন মেলা : কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে মরমী শিল্পী লালন সাঁইয়ের সমাধিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দুইবার লালন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তার একটি হচ্ছে লালন সাঁইজির তিরোধান  উপলক্ষে এবং অন্যটি দোল পূর্ণিমায় লালন প্রবর্তিত সাধু সঙ্গক উপলক্ষে।

*** মধু মেলা : যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাড়িতে প্রতিবছর বসে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলা। বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে হয় এ মেলার আয়োজন।

*** বটতলায় বউ মেলা : নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ৪০০ বছরের পুরনো একটি বটগাছ কে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে পালিত হচ্ছে বউ মেলা। বৈশাখ মাসের দ্বিতীয় দিনে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা পরিবারের সুখ শান্তি ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে এখানকার বটগাছ কে পূজা করেন। এ উপলক্ষে পাঁচ দিনের মেলাও বসে বটগাছের চারপাশে।

*** গুড় পুকুরের মেলা : গুড় পুকুরের মেলা  অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলের সর্বশেষ জেলা সাতক্ষীরা জেলায়। মনসা ও বিশ্বকর্মা পূজা উপলক্ষে ভাদ্র মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ মেলা। ঐতিহ্যগত ভাবে বছরের পর বছর পালিত হয়ে আসছে এই মেলাটি। গুড়পুকুর মেলায় অংশ নিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা এবং ভারতের কলিকাতা সহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাতক্ষীরায় লোকসমাগম ঘটে। গুড়পুকুর মেলাটি মূলত হিন্দুদের উৎসব বা মেলা ছিল। জনশ্রুতি রয়েছে বাংলা ১০৭০ সালের দিকে সর্বপ্রথম এই মেলা সূচনা হয়। তবে কালের পরিক্রমায় এটি সকল ধর্মের মানুষের প্রাণের মেলায় রূপান্তরিত হয়। তবে কে বা কারা মেলাটির গোড়া পত্তন করেছিলেন তার কোন ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না। মেলায় স্থলে একটি পুকুর রয়েছে আর ওই পুকুরটির নাম গুড় পুকুর। গুড় পুকুর নানা কারণের ক্ষেত্রে অভিমত রয়েছে, পুকুরে মনসা পূজার বাতাসা ফেলা হতো আর ওই বাতাসার জন্য পুকুরের পানি মিষ্টি লাগতো বলেই এ ধরনের নামকরণ হয়েছে। আবার কারো কারো মতে, এই পুকুরে বেশি দিন পানি থাকতো না। পরে কে বা কারা স্বপ্নে দেখেন পুকুরে ১০০ ভাঁড় গুড় ঢালতে হবে তাহলে পুকুর পানিতে ভরে থাকবে। স্বপ্ন অনুযায়ী পুকুরে ১০০ ভাঁড় গুড় ঢালা হয় ফলে পুকুর পানিতে ভরে উঠে। আর সেখান থেকেই এই পুকুরের নাম হয় গুড় পুকুর। আবার কেউ কেউ বলেন, এক সময় এই পুকুরের তলদেশ থেকে মিষ্টি পানি উঠতো, আর সেজন্যই এ পুকুরের নাম এমনটি হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক আব্দুস সুবহান খান চৌধুরীর মতে, সাতক্ষীরার চৌধুরী পাড়ার রায়চৌধুরীরা গৌরবর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাই তাদের পুকুরকে বলা হতো গৌডরদের পুকুর। সেই ‘গৌরদের পুকুর’ কথাটি এক সময় বিবর্তন হয়ে দাঁড়ায় ‘গুড় পুকুর’।

*** গাজনের মেলা: বাংলা গাজন শব্দটি গর্জন শব্দ থেকে ব্যুৎপন্ন হয়েছে। এই উৎসবের অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসীরা প্রচন্ড গর্জন করেন বলেই উৎসবের এরূপ নামকরণ করা হয়। অপর মতে, ‘গা’ শব্দের অর্থ গ্রাম এবং ‘জন’ শব্দের অর্থ জনসাধারন, গ্রামীণ জনসাধারণের উৎসব হওয়ায় এই উৎসবের নাম এইরকম নামকরণ করা হয়।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, গাজন উৎসবে তিনি দেবী হরকালীর সঙ্গে শিবের বিবাহ হয়। বিবাহ উৎসবে সন্ন্যাসীরা বর যাত্রী হিসেবে অংশ নেন। অন্যদিকে, ধর্ম ঠাকুরের গাজন হল ধর্ম ঠাকুর ও দেবী কামিনী কামাখ্যার দেবী মুক্তির বিবাহ উৎসব।

রাঢ়বঙ্গের শৈব-সংস্কৃতির একটি বিশেষ অঙ্গ হচ্ছে ‘গাজন’। গাজন অর্থই ‘গা=গ্রাম, জন=জনগণ)গ্রামের জনগণের নিজস্ব উৎসব। গাজন হচ্ছে বাংলাদেশের লৌকিক উৎসব। ইহা নিম্নশ্রেণীর লোকের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বাংলাদেশে ইহা নানা পৌরাণিক ও লৌকিক দেবতার নামের সহিত যুক্ত হইয়াছে, যেমন শিবের গাজন, ধর্মের গাজন, নীলের গাজন, আদ্যের গাজন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই উৎসবের লক্ষ্যে সূর্য এবং তাহার পত্নী বলিয়া কল্পিত পৃথিবী। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর বিবাহ দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য। চৈত্র মাস হইতেই বর্ষার প্রারম্ভ পর্যন্ত সূর্য যখন প্রচন্ড অগ্নিময় রূপ ধারণ করে তখন সূর্যের তেজ প্রশমন ও সুদৃষ্টির আশায় কৃষিজীবী সমাজ এই অনুষ্ঠানের উদ্ভাবন করেছিল। যে শিবকে  সারা বছর আগলে রাখেন ব্রাহ্মণেরা, গাজনের কদিন সেই শিব সমাজের নিম্ন কোটির মানুষের হাতে পূজা গ্রহণ করেন। এখানে কোন ভেদাভেদ নেই, জাত নেই, কুল নেই, উচ্চবর্ণের অবজ্ঞা অবহেলা নেই। নেই কোন ধর্মের বাড়াবাড়ি। এ কদিন সবাই সমান মর্যাদায় সমাসীন। এখানেই শিব সংস্কৃতির সঠিক উত্তরণ। গাজনের সময় ঠিক প্রকৃত অর্থে গণদেবতা।

*** বউ মেলা : আদিবাসী বউ মেলায় রকমারি পণ্য কিনতে পাওয়া গেলেও সত্যিকারের কোন বউ কেনা-বেচা হয় না। শুধু বেছে নিতে হয় সারা জীবনের সঙ্গী। এদের বিবাহ বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। প্রাণ থাকতে ছাড়াছাড়ির সুযোগ নেই এসব দম্পতির। মৃত্যুই হচ্ছে জীবনসঙ্গী সঙ্গিনীর বিচ্ছেদের একমাত্র পথ। একাধিক বিয়েরও অনুমতি নেই। তাই বাছাবাছির পর্ব হাতছাড়া করতে চাই না কেউ। সমতল ভূমির আদিবাসীদের বউ খোঁজার এ আদি মেলা বসে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জের হাইস্কুল মাঠে বছরে একবার।

মেলায় আগতদের বেশির ভাগের বয়স ১৮ পেরিয়ে ২৫ এর ঘর ছুঁই ছুই। রকমারি সাজের তরুণ তরুণীর ভিড় বাড়তে বাড়তে হাজার ছাড়িয়ে যায়। ভালো লাগা প্রিয় মুখটি কার নজরে পড়বে বলা ভার। নজর কাটতে তরুণীরা নিজেকে মেলে ধরেছে রঙ্গিন বিশেষ পোশাকে। টুকটুকে রঙিন ফুলেল সাজ। তাদের দৃষ্টি রুমাল বাঁধা হাতের দিকে। বিপরীত লিঙ্গের কোন দৃষ্টি কাড়তে হাতে রুমাল বেঁধে মেলায় আসে তরুণরা। এরকম শত শত তরুনীর ভিড়ে পদ ভারে মুখরিত তরুণের দল। নজরের তীর বিদ্ধ করবে কার নজর ? জয় করবে কোন হৃদয় ? বন্ধনে জড়াবে সারাটা জীবনের জন্য ! সন্ধ্যা গড়ানোর আগে বেঁধে ফেলতে হবে সঙ্গী। তারপর শুরু হবে একজোড়া জীবনের সুখ-দুঃখ ভরা স্বপ্নময় জীবনের পথ চলার পর্ব। নয়তো নিঃসঙ্গ হয়ে, নিঃশব্দে গুনতে হবে পুরো একটি বছর।

প্রতিবছর দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীর পরদিন এ মেলায় জড়ায় বিয়ের বয়সী পাত্র-পাত্রীরা। মূলত বর কনে পছন্দের জন্য মেলায় ভিড় জমায় তারা। সঙ্গে অন্য অভিভাবকরাও থাকেন। বাদ্য-বাজনার মাতাল হাওয়ায় নাচের তালে চলে বউ বাছাইয়ের উৎসব। মাদলের তালে তালে ভাটা পড়ে না পছন্দের মানুষকে খোঁজার কাজটি। এ উৎসব শুধু নৃ-গুষ্টির কিছু মানুষকেই আনন্দ দেয় না। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও আসে আনন্দে শরিক হতে। পরিণত হয় মিলনমেলায়। কতশত বছর আগে এ বউ মেলার শুরু হয় তা কেউ বলতে পারেননি এলাকার মানুষ।

যে দেশে আমাদের সবার পরিচয় হবে একটাই-আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের প্রিয় স্বদেশ। এই স্বাধীন স্বদেশের ভূমিতে কোনভাবেই যেন উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠী ও বিদেশী অপসংস্কৃতি আগ্রাসন আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেটাই হোক আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও মেলা পত্তন এর অঙ্গীকার । বাঙালি বার বার বিদেশি শক্তির শাসন-শোষণে নিঃগৃহীত হয়েছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উৎসব পালনে বাঙালি জাতিকে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে যা আজ ইতিহাস। হাজার হাজার বছরের বাঙালিয়ানার নিদর্শন মেলা। মেলা ছাড়া বাঙালিত্ব যেন পূর্ণতাই পায়না। মেলায় বাঙালির চেয়ে খুশি আর বুঝি কোন জাতি হয় না। সব অশুভ ও তৎপরতা কাটিয়ে বাঙালির সম্প্রীতির মিলন উৎসব মেলা আরও লাখ বছর বেঁচে থাকুক তার স্বতন্ত্র ঐতিহ্য নিয়ে। তাই যুগ যুগ ধরে বহমান বৈশাখী উৎসব ও মেলা বাঙালি সংস্কৃতির শিকড়ে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছে।

 

***সমাপ্ত***