********গাজিবর রহমান
(নাট্য গবেষক)
***************************************************
‘Folklore’ শব্দটিতে লোকসংস্কৃতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, এ নিয়ে পন্ডিত ও কবি শক্তির মধ্যে নানা মত রয়েছে। ‘Folk’ অর্থে লোক শব্দটি প্রায় সব বিশেষজ্ঞই গ্রহণ করলেও, বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিবিদরা ইংরেজি Folk শব্দ ঠিকই বাংলায় ব্যবহার করেন। তবে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে ‘Lore’ শব্দটি নিয়ে। শব্দটি প্রাচীন ইংরেজিতে ছিল ‘Lar’ ডাচ ভাষায় ‘Lier’ জার্মান ভাষায় ‘Lewre’ । প্রাচীন টিউটনিক ভাষায় শব্দটির মূল উৎস রয়েছে-যার অর্থ জ্ঞান দান বা আহরণ করা। পরে অর্থবিন্যাসে এর পরিবর্তন হয়-প্রাচীন বিশ্বাস, কাহিনী বা ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রভৃতি বুঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহৃত হলেও ধীরে ধীরে এর অর্থ দাঁড়ায় ‘Wisdom of the folk’ ।
‘Lore’ শব্দটি নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হলেও লোকসংস্কৃতি শব্দটিই ‘Folklore’ এর বাংলা প্রতিশব্দ রুপই এখন প্রচলিত। অবশ্য বিভিন্ন মনীষীরা এর বিরুদ্ধে তাদের মত দিয়েছেন। যেমন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র ‘Folklore’ বলতে লোক যাত্রা কে বুঝিয়েছেন; আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন ‘লোকযান’; সুকুমার সেন বলেছেন লোকচর্চা; মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন ‘লোক্যবিজ্ঞান’; আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন ‘লোকস্রুতি’। এতসব মতপার্থক্য থাকলেও জনপ্রিয়তম শব্দ হিসেবে ‘Folklore’ এর প্রতিশব্দ হিসেবে লোকসংস্কৃতি বর্তমানে প্রচলিত ও পরিচিত। ‘Folklore’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন উইলিয়াম জন থমস তাঁর ‘দ্য এথেনিয়ামস’ পত্রিকায় লেখা একটি চিঠিতে। এই ইংরেজি পরিভাষাটি সম্ভবত জার্মান ‘Volkskunde’ শব্দের অনুবাদ। কারণ জার্মান ‘Volks’ শব্দের সঙ্গে ইংরেজি ‘Folk’ শব্দের উচ্চারণগত ও অর্থগত সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এর সংজ্ঞা আর তাৎপর্য নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।
ফোক শব্দটির অর্থ লোক। লক্ষ্য অর্থে মানুষজনও বোঝায়। মানুষজন বলতে এখানে বুঝতে হবে একাত্মক সম্প্রদায়, কোম শ্রেণীর মানুষ এক সংহত আত্মজ আদিবাসীগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠীর বা লোকসমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মূলত বংশ পরম্পরায় এক অবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক ধারায় প্রবাহিত। লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্যের আলোচনায় এক সামগ্রিকতাও একটা বিষয় স্পষ্ট যে এর সঙ্গে সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব, সাহিত্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিদ্যাশৃঙ্খলার সরাসরি যোগ রয়েছে। এক কথায় বলা যায় যে, লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য একটি জাতির সামগ্রিক ইতিহাস কে নিজের মধ্যে ধারণ করে রাখে। সুতরাং এর অধ্যায়ন প্রক্রিয়াটাও বিজ্ঞানসম্মত হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহ সংরক্ষণ ও অধ্যায়ন যথাযথ ও বিজ্ঞানসম্মত হলে তবেই লোকসংস্কৃতির চর্চার মূল উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে। এর জন্য লোকসংস্কৃতির গবেষক কে ক্ষেত্র সমীক্ষা ও লোকসংস্কৃতি অধ্যায়নের বিভিন্ন পদ্ধতিগুলোর সম্মুখ ধারনা থাকা খুবই জরুরী।
বাঙালির আছে হাজার বছরের লোকঐতিহ্যকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি। গ্রামীণ মানুষের জীবনাচারের সঙ্গে এই সংস্কৃতি আবহমানকাল ধরে পরস্পরাগতভাবে যুক্ত। বাঙালির লোকসংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আমাদের লোকসংস্কৃতিই হল নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল সংস্কৃতি। সংস্কৃতির একটি বৃহত্তর সংজ্ঞায় বলা হয় ‘আমরা যা তাই আমাদের সংস্কৃতি’। এখনো পরম মমতায় গ্রামীণ মানুষ তাঁর নিজস্ব আচার-সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। যুগ যুগ ধরে সাধারন মানুষ যে সংস্কৃতি লালন করে আসছে সাধারণ অর্থে তাই সংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির বিশেষত্ব নিহত আছে ‘লোক’ কথাটির মধ্যে। লোকসংস্কৃতির জন্ম সাধারণ মানুষের মুখে মুখে, তাদের চিন্তায় ও কর্মে। ঐতিহ্য অনুসারে বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস, আচার-আচরণ ও অনুষ্ঠান, জীবন-যাপন প্রণালী, শিল্প ও বিনোদন ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা সংস্কৃতিকে সহজ ভাষায় লোকসংস্কৃতি বলা হয়। আদিকাল থেকেই বাঙালিরা লোকসংস্কৃতি লালন করে আসছে। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি এদেশের কৃষিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি বিরাজমান রয়েছে, জনসংস্কৃতির নানা ধারা ও উপধারা এখনো গ্রামীন সমাজ জীবনে সজীব ও প্রাণবান। গ্রামীণ বাংলার খাওয়া-দাওয়া, স্থাপত্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, পুরাকৃতি, লোকধর্ম, দর্শন, বাদ্যযন্ত্র চর্চা, লোকনৃত্য, লোকসংগীত, কাঠের ভাস্কর্য, লোকনাট্য সবকিছু যুগের পর যুগ ধরে গৌরবান্বিত ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। বাংলার লোকসংস্কৃতি শত সহস্র ভাবুক-দার্শনিক-শিল্পী নানা ধারার গান, নাট্য, আচার সাহিত্যকে এখনো জিইয়ে রেখেছে। আসলে গ্রামের সংস্কৃতিটাই ভিন্ন। এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত লেখক যেমন রচনা করেছেন নবীর জীবন কাহিনী নিয়ে পুঁথি । তেমনি মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত লেখক রচনা করেছেন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলাকাব্য। এই সমন্বয়বাদী ঐতিহ্যই গ্রামীণ বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির মূল দর্শন, মূল চেতনা। তাদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সমন্বয়বাদী চেতনা ; যার মর্মমূলে রয়েছে অসাম্প্রদায়িকতা, সহাবস্থান, মানবিকতা আর সৌহার্দ্য। তবে কালের পরিক্রমায় অনেক কিছুতেই পরিবর্তন এসেছে।
আদিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু থেকেই লোকসাহিত্যের উৎপত্তি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাংলা ব্রত গ্রন্থে বলেন, “সব উপরে হিন্দু অনুষ্ঠানের অনেকটা গঙ্গামৃত্তিকা, গৈরীকী, তেমনি সব নানা মাটির একটা খুব মোটা রকমের স্তর; তার ওপর বৈদিক আমলের মূল্যবান ধাতুস্তর; তারতলায় অনাব্রতদের এইসব ব্রত একেবারেই মাটির বুকের মধ্যেই গোপন ভান্ডারে।”লোকসংস্কৃতির অন্তর্গত ‘লোক’ বলতে কোন একজন মানুষ নয়, একদল মানুষ বোঝায়। এই মানুষ গুষ্টিবদ্ধভাবে একত্রে বসবাস করে। তাদের ,বিশ্বাস-সংস্কার, আচার-আচরণ, প্রথা-পদ্ধতি, উৎসব-অনুষ্ঠান ইত্যাদি জীবন সংলগ্ন সমস্ত কিছুকে নিয়েই লোকজীবনের ধারা বহমান। অন্যদিকে ‘সংস্কৃতি’ শব্দটির মধ্যে নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, সাহিত্য, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য ইত্যাদির যোগ নিবিড়। গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ জীবনে লোকসংস্কৃতির বিস্তৃতি বা পরিধি রেখাটি যত বড়ই হোক না কেন; তা বিশ্ববাসীর স্বাভাবিক মানববন্ধনশৃঙ্খলে আবদ্ধ।
বাংলাদেশ আজও একটি কৃষি প্রধান দেশ। ফলে কৃষকের জীবনের কর্ম প্রবাহের সমষ্টিই হল এখানকার লোকদের সংস্কৃতি তথা লোকসংস্কৃতি। বাংলার লোকসংস্কৃতির বড় উপাদান হল এর ভাষা। বাংলা নামের এ দেশটির নামকরণই হয়েছে এর ভাষা গত অবস্থার কারণে। খ্রিস্টপূর্ব যুগে আগত গৌতম বুদ্ধ নিজে যেসব বর্ণমালা শিখেছিলেন, বলা হয়ে থাকে, তার মধ্যে বাংলা বর্ণমালা ছিল। চর্যাপদের কবিদের মধ্যে দেখা যায় বারোমাসির প্রয়োগ। এর মানে এখানকার লোকজ জীবনের আনুসংঘ হিসেবে বারোমাসি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এখানকার আবহাওয়াগত কারণে মানুষের ঘর তৈরিতে যেসব উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটি, ছন, নলখাগড়া, কাঠ ইত্যাদি ব্যবহার ছিল মূল। পরবর্তীতে পোড়ামাটি, সান ইত্যাদির ব্যবহারের পাশাপাশি এসেছে কারো গেটে টিনের ব্যবহার থেকে শুরু করে আধুনিক কালের বহুতল ভবন নির্মাণের কাল। কিন্তু কালের বিবর্তন আমাদের চাকাকে যেদিকেই নিয়ে যাক না কেন এখানকার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ক্ষনার বচন আজও তাকে পথ দেখায়। কৃষক কখন তার জমিতে বীজ বপন করবে, কোন সময়ে বৃষ্টি হলে কৃষকের জীবনের দুর্যোগ নেমে আসবে, কোন সময়ে বৃষ্টি হলে ‘ধন্য রাজার পুন্য দেশ’ আবার কতগুলো কলাঝাড় থাকলে একজন কৃষক মাচায় শুয়ে থাকার যোগ্যতা অর্জন করত-এ কৃষিভিত্তিক সমাজের সেই খনার বচনে নির্দেশিত। এখনো মানুষ এমনকি আধুনিক স্থাপত্যও বাড়ি তৈরি করতে খনার বচনকে সামনে রেখে কাজ করে। ‘দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা’ ‘উত্তরদুয়ারি তারি প্রজা’ ‘পুব দুয়ারির মুখে ছাই’ ‘পশ্চিম দুয়ারির খাজনা নাই’। খনার এ বচন তো এখনো দালানকোঠা নির্মাণের সময় বাড়ি দিতে বা ফ্লাট নির্মাণেও দক্ষিণ দুয়ারী হতে চায়। দক্ষিণ দুয়ারির এই যে মানসিকতা এখানেই আমাদের লোকসংস্কৃতির প্রভাবটি ধরা পড়ে।
অজস্র শিল্পী, সাধক, কীর্তনীয়া, বাউল, ফকিরও সাধু-শান্তদের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল এই বদ্বীপ। গ্রামীণ জনপদ মাতানো বহুবর্ণিল সেই সুর আবহমান আপন চেহারা হারিয়ে পাংশুটে ও বিবর্ণ হয়ে পড়লেও এই শ্রেণীভুক্ত সাধকেরা এখনও সমন্বয়বাদীর সুর ছড়িয়ে দিচ্ছেন । অলৌকিক সমাজের মানুষ এসব সমন্বয়ের বার্তা মন থেকেই মানতেন এবং চর্চা করতেন।
এছাড়া লোকসংস্কৃতিতে আরো বিদ্যমান রয়েছে বাঁশ ও বেতের কাজ, মাটির তৈরি হাঁড়ি পাতিল, কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, কাঁথার কারুকাজ, দাঁড়িয়া বান্দা, গোল্লাছুট, কানামাছি, ছি-বুড়ি, ডাঙ্গুলী খেলা, বলি খেলা, লাঠি বাড়ি খেলা, ঘুড়ি উড়ানো, নানা ধরনের মেলা, তীর্থ ভ্রমণ, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়ানো, যৌথ পরিবার, বড়দের মান্য করা, ছোটদের স্নেহ করা, সন্তান জন্মদানে আঁতুড় ঘর, পাটের, শনের, ধানের, চালের বহুমুখী ব্যবহার, নৌকাবাইজ, ঘোড়া দোড়ানো, মইদোড়, লাঙ্গলদৌড়, কেশকামলা, মোরগ লড়াই, বিলের মাছ ধরতে হাত বাওয়া, কোন পাখির ডাককে কল্যাণ-অকল্যাণ জ্ঞান করা ইত্যাদি বহুমুখী ধারায় লোকসংস্কৃতির বিচরণ। এর কোন কোনটা আধুনা সংস্কার না হয়ে কুসংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিষয়টি কু-হোক আর সু-হোক লোকসংস্কৃতির উপাদান তো বটেই।
লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাসকে গ্রামের মানুষেরা নিজেদের সংস্কৃতিতে ঠাঁই দিয়েছেন । ফলে দুর্যোগ-দূর্বিপাকে, অমঙ্গল দূরীকরণে মানুষজন পীর-ফকির-সাধু-সন্তের যেমন দ্বারস্থ হতেন, তেমনি পীর, দরবেশ কিংবা দেবদেবীর কাছে মানত করে সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে মানসিক শান্তিও পেতেন। বন্যা খরা কিংবা শিলা বৃষ্টি থেকে ফসল রক্ষা, বন্ধ্যা নারীর সন্তান কামনা, স্বামীকে বশে আনা ও প্রেমিক-প্রেমিকাকে বসে আনা থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক চলাফেরায় নানা সমস্যার সমাধান লোকসংস্কার ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ীই গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় মানুষজন করতেন। গ্রামীন সমাজে ওঝা, কবিরাজ, তান্ত্রিক, মাওলানারাই বৈদ্যের ভূমিকা পালন করতেন। ঝাড়-ফোঁক, মন্ত্র, দোয়া, তাবিজ, বর্শীকরণ তাবিজ ইত্যাদির সাহায্যেই নতুন-পুরাতন রোগ সারানোর কাজ করতেন বৈদ্য ও হেকিমরা।
এখানে লোকসংস্কৃতির আরো কিছু কথা বলা যায়, ব্যবসায়ীরা বছরের প্রথম দিন থেকেই খুলে নতুন খাতা, যাকে বলা হয় হালখাতা। মুসলমান ব্যবসায়ীরা এই দিন আয়োজন করে মিলাদের। প্রিয়জনকে বই দেয়া ,বইমেলার আয়োজন, নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ড পাঠানো, পুইনাহ অনুষ্ঠান। উপজাতীয়দের বৈশাবি উৎসব, বাচ্চাকাচ্চাদের বেঙ্গাবেঙ্গির বিয়ে, বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা, মাঙ্গনের গান, গম্ভীরা গানের মাধ্যমে আত্মসমালোচনা ইত্যাদি নানা ধারায় পহেলা বৈশাখ লোকসংস্কৃতির প্রাচীন ধারাটি আধুনিকতার সাথে সেতু বন্ধন তৈরি করে বাঙালির আবহমানকালের ঐতিহ্যকে লালন করে চলেছে। বৈশ্বিক সাংস্কৃতির প্রেক্ষাপট বিচার করে বলা যায়, বাংলার লোকসংস্কৃতি বহুমুখী ধারায় বিকশিত এক উন্নত ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীতে কৃষি উৎপাদনের সময় নানামুখী লোকাচারে ও গানের ব্যবহার রয়েছে। হাল চাষ, বীজ রোপন, ফসল কাটা থেকে ঘরে তোলা পর্যন্ত নানারকম উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে আনুষঙ্গিক লোকাচার হিসেবে গান ও মন্ত্র পরিবেশিত হয়। গ্রামীণ লোকাচারের এ ধারণাগুলো নির্দিষ্ট দিন-ক্ষণ মেনে কৃষকেরা পালন করে থাকেন। একইভাবে জেলে, কুমার, কামারসহ নানা লোকায়ত পেশার মানুষের মধ্যেও নানা লোকাচারের প্রচলন আছে। মহররম উৎসব, দোল উৎসবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনেও শেষ পর্যন্ত গানই প্রধান হয়ে উঠে। জাত পাত বৈষম্য আর ভেদাভেদ ভুলে সেই আনন্দযজ্ঞে গান ভাসান গ্রামীণ মানুষ।
আদিম সংস্কৃতি বাংলার সুদূর অতীতের কৌমসমাজের স্মৃতিনির্ভর আদিবাসীদের সংস্কৃতি। বাংলার লোকসংস্কৃতি সঙ্গে এই আদিম সংস্কৃতি রয়েছে প্রচ্ছন্ন আত্মীয়তা। লোকসংস্কৃতি বাঙালির সংস্কৃতির মূলধারা। প্রমোদ বিনোদনের মধ্য দিয়ে বাঙালির লোকসংস্কৃতির রূপ ফুটে ওঠে। সাংস্কৃতি প্রবাহমান নদীর মত -এর রূপান্তর আছে, মৃত্যু নেই। মানুষের জীবনচর্চা ও চর্যার বৈচিত্র্যময় সমন্বিত রুপই লোকসংস্কৃতি। সামাজিক মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি, ধারাবাহিক ঐতিহ্য, প্রজন্ম পরস্পরা আচার-বিশ্বাস,ভূয়োদর্শন, শিল্পবোদের নিদর্শন, মানন-রুচি, নীতি-নৈতিকতা এসবই লোকসংস্কৃতির মৌল উপকরণ। লোকসংস্কৃতির পরিধি বিশাল ও ব্যাপক। তাই কোন একটি নির্দিষ্ট ছকে বাধা সংজ্ঞার সূত্রে এর সীমা সরহদ্দ এঁকে দেওয়া চলে না। দেশ-কাল-ভাষা-ধর্মভেদে সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন ধারায় রূপ পায়।
আমাদের গ্রামীণ বাংলার যে উঠোন, সেখানে লোকসংস্কৃতির অসংখ্য পরিবেশনায় মুখর হয়ে থাকে বারো মাস। অবসর পেলেই গ্রামের মানুষ বসান গান লোকনৃত্য কিংবা লোকনাট্যের আসর। যাত্রাপালা, পালা গান, বাউল গান, কীর্তন গান, গাজীর কিচ্ছা, কিচ্ছা পাঠের আসর, মনসার গান, মাদার পীরের গান, ভাটিয়ালি, ধামাইল গান, বারোমাসি ও সূর্যরথের গান পুঁথি পাঠ নানা পরিবেশন এখানে হয়। এক গ্রামের যশস্বী শিল্পীর ডাক পড়ে আরেক গ্রামে। গানের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার এ বড় অদ্ভুত সম্মিলন। তাদের শিল্পী সত্তা ও প্রকৃতিপ্রদত্ত। যুগ যুগ ধরে তারা বংশপরস্পরায় সাংস্কৃতির এ ধারা বহমান রেখেছেন। দিনে যে মাঝি খেয়া নৌকা চালায়, যে জেলে মাছ ধরে কিংবা যে কৃষক মাঠে ফসল ফলায়-রাতে তারাই মশগুর কীর্তনীয়া, যাত্রাভিনয়শিল্পী অথবা দক্ষ পালাকার। এদের কারো কারো একতারা, দোতারা, ডপ্কি, ঢোল, মন্দিরা, করতাল, বাঁশিসহ লোকবাদ্যের লহরীতে মুখরিত হয় গ্রামের পারিপার্শ্ব, বিমুগ্ধ হয় মানুষ। বাংলার আনাচে কানাচে লোকসাহিত্যের পাড়াতে পাড়াতে মিশে আছে গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং সমাজে প্রচলিত আছে এর মধ্যে লোককাহিনী, ছড়া গান, খনার বচন, ধাঁধা, প্রবাদ প্রবচন, মন্ত্র, লোককথা, লোকগীতি উল্লেখযোগ্য।
প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিই বাঙালির সংস্কৃতির মূলধারা, এর মর্মমূলেই আবহমান বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় প্রোথিত। বাংলার লোকসংস্কৃতির জগত বিচিত্র ব্যাপক। বাংলার লোকসংস্কৃতি বঙ্গ জনপদবাসীর যৌথ জীবন চর্চার এক আন্তরিক ভাষ্য। সমন্বয়, সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যোর এক অপূর্ব নিদর্শন এর সাক্ষ্য বহন করে বাংলার এই লোকসংস্কৃতি। ইতিহাসের সূচনা লগ্নের বঙ্গ জনপদের আদিম আদিবাসিদের বিশ্বাস সংস্কার ও লোকাচারকে কেন্দ্র করেই এই লোকসংস্কৃতির জন্ম। নানা জনগোষ্ঠীর রক্তের মিশ্রণে যেমন বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে, তেমনি তার সংস্কৃতি সম্পর্কেও এ কথা সত্য। সুদূর অতীতের স্মৃতিচিহ্নবাহী বাংলার লোকসংস্কৃতি তাই ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যে’র ধারণাটি সমর্থক করে তুলেছে।
এছাড়া গ্রামীন জীবন যাত্রায় আরও লোকসংস্কৃতিতে দেখা যায় পাড়া গাঁয়ে বা গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা মাটির কুঁড়ে ঘর ছন ও পাটখড়ির বেড়া তাতে রং করা বিভিন্ন চিত্র আঁকা । গ্রামীণ নারীরা পরম মমতায় ঐতিহ্য পরস্পরাকে আগলে ধরে রেখেছেন নকশি কাঁথা তারা কেবল চোখের ঠাহরে এবড়ো থেবড়ো করে ভুল বানানে কাঁথায় লিখে ফেলেছেন মনের সব অব্যক্ত কথা। লোকশিল্পের এ বড় অদ্ভুত বিকাশ।
বাংলার লোকসংস্কৃতির উপাদান বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় আনন্দ রূপের সন্ধান। প্রবল জীবনাগ্রহ প্রতিবাদী চেতনা। জাত-ধর্ম-গোত্র বর্ণনির্বিশেষ মানুষের কথা। মানবিকতা ও ইহজাগতিকতার পরিচয়। লোকায়ত বাংলার উদার মানবিক জমিনের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী চিরকালই ভাববিদ্রোহী মিলনপ্রয়াসী, সমন্বয়পন্থী। ‘বিবাদে বিরোধে বর্বরতা’ – একথা অলৌকিক সমাজের মানুষ তাদের জীবনাচরণে সত্য বলে মেনেছে। যেমন, মানবজমিন আমাদের মরমী কৃষক, ফকির লালন সাঁইয়ের গানে জাতধর্মের বিভক্তি, ছুতমার্গ-অস্পৃশ্যতা নিন্দিত হয়েছে। বর্ণভেদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। ধর্মীয় জাতিত্যের অবিশ্বাসী লালন ফকির জাতিত্বের জাত হাতে পেলে আগুন দিয়ে পুড়ানোর অস্বীকার ঘোষণা করেছেন। মানবতার আদর্শে অনুপ্রাণিত লালন সম্প্রদায়িক ভেদাভেদ লুপ্ত করার পক্ষে মত প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সব লোকই কই লালন ফকির হিন্দু কি যবন।/লালন বলে আমার আমি না জানি সন্ধান।।’ পাশাপাশি ইহজাগতিকতার উচ্চারণও শুনি লালনের গানে, ‘এমন মানব জনম আর কি হবে।/মন যা করো তরাই করো এই এভবে।। কত ভাগ্যের ফলে না জানি/মন রে পেয়েছো এই মানব-তরণী/দিয়ে যাও ত্বরায় সুধারায়/যেন ভারা না ডুবে ।।’
শুধু তা-ই নয়, লালন ফকির বাংলার লোকসমাজের এই মহত্তম মরমী সংস্কৃতি প্রতিনিধি জমিদারের পীড়ন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে একতারা ফেলে লাঠি নিয়ে রুখে দাঁড়াতেও পিছপা হননি। লালনের শিষ্য দুদ্দু শাহও ছিলেন সামাজিক অঙ্গীকারে দৃঢ়-দীপ্ত মুক্তমনের সাধক বাউল। এইভাবে দূর অতীতের কৃষি সমাজের স্মৃতিবাহী বাউল গান অন্তরে দ্রোহের আগুন জ্বেলে বাংলার লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে উঠেছে।
কিছু রীতি বা আচারের উপর ভিত্তি করে লোকসংস্কৃতি গড়ে ওঠে যেমন : ভূতের ভয়: লোকসমাজের মাঝে ভূতের ভয় থেকে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্র, যেমন: শাঁখচুন্নি, মামদো ভূত ইত্যাদি। এছাড়া ভূত তাড়ানোর পেশা যেমন: ওঝা প্রভৃতিও তৈরি হয়েছে।
অশুভ দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য , লোকসমাজের বিশ্বাস রয়েছে, বাচ্চার উপর অশুভ দৃষ্টি পড়লে তার ক্ষতি হতে পারে, এর জন্য প্রায়শই বাচ্চাদের কপালের পাশে কাজলের টিপ দেওয়া হয়। এছাড়াও আছে বিয়ের অনুষ্ঠানে গায়ে হলুদের প্রচলন।
এই লোকসংস্কৃতি চর্চার ভেতর দিয়েই একদিন বাঙালির আত্মপরিচয় সন্ধান ও স্বরূপ অন্বেষার সূচনা হয়েছিল। স্বাদেশিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত রবীন্দ্রনাথই ছিলেন তার ঋত্বিক। গুরুসদয় দত্ত এই লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ব্রতচারী আন্দোলন। বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ উদঘাটনে লোকসংস্কৃতি ছিল অন্যতম অবলম্বন। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী যুগের গানের কথা বলতে হয়। বাউল সারি বা ভাটিয়ালির সুর বসিয়ে রচনা করা তাঁর সেই সব স্বদেশী গান কি অবিস্মরণীয় উদ্দীপনা জাগিয়েছিল বাঙালির মনে। তা আজ ইতিহাসের অন্তর্গত। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’- যে গানটি আজ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, সেই গানের কথা ও সুরের জন্যও রবীন্দ্রনাথকে শিলাইদহের মরমী কবি গগন হরকরার বাউল গানের কাছে যেতে হয়েছিল। চারণ কবি মুকুন্দ দাসের অলৌকিক আঙ্গিকে রচিত স্বদেশী যাত্রাপালা ও জাগরণমন্ত্রের উদ্দীপক গান বাঙালিকে মুক্তি পাগল করেছিল। আমাদের দেশের নানা সংগ্রাম আন্দোলনেও অলৌকিক সমাজের কবি ও গায়কদের বিশেষ ভূমিকা আছে। কবি আল রমেশ শীল, বিজয় সরকার, শাহ আব্দুল করিমের মতো মরমী লোককবিও ভাষা আন্দোলন গান রচনায় প্রাণিত করেছে। ভাষা সংগ্রামের গান বেঁধে এক বাউল কবি, মহিন শাহ, পুলিশের হাতে লাঞ্চিত হন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রীতি ও লোককবিদের রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাই লোকসংস্কৃতি বাঙালি জীবনের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণার নিদর্শন।
জাতির ক্রান্তিলগ্নে কিংবা জাগৃতি মুহূর্তে তার ঐতিহ্যলগ্ন আত্মপরিচয় সম্পর্কে কৌতুহল ও সন্ধিৎসা জাগে, যেমন জেগেছিল স্বদেশী আন্দোলনের যুগে এবং উত্তর সময়ে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের কালে। তাই বারবার ফিরে ফিরে যেতে হয় উৎসের কাছে -পিতৃপুরুষের নিবাস আর স্মৃতির কাছে। প্রকৃতপক্ষে গ্রাম এবং তার সংস্কৃতি আমাদের পরিচয় এর যথার্থ ঠিকুজি। বিশাল বাংলার যে গ্রামকে নিয়ে আমাদের সংস্কৃতি, সভ্যতা, আমাদের স্মৃতি-স্বপ্ন, গৌরব, ঐতিহ্য, ইতিহাস তাকে আবিষ্কারের মাধ্যমেই আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ উন্মোচিত হবে। সে-ই হবে বিস্মৃত-বিভ্রান্ত বাঙালির সত্যিকারের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’।
এত বেশি ব্যক্তির জাতির আত্মপরিচয় তার লোকসংস্কৃতি। আর বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি এদেশের মূল সংস্কৃতির ভিত্তি। এখানকার সাহিত্য, জীবনবোধ, মুক্তিযুদ্ধ, জীবানাচরণ লোকসংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে।
লোকসংস্কৃতির প্রভাব বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে বিদ্যমান। একটা চর্যাপদে বর্ণিত জীবন বিশ্লেষণে বুদ্ধনাটকের অভিনয় দেখা যায় “নাচন্তী বাজিল গান্তী দেবী। বুদ্ধ নাটক বিসমা হোই”।। পরবর্তীকালে চন্ডীদাসের রামী, মঙ্গলকাব্যের মনসা, চন্ডীমঙ্গলের শিব-শিবানী, দরিদ্র ব্যাধ কালকেতু, ঈশ্বরী পাটনী, পূর্ব বঙ্গীয় গীতিকার সাধারণ নর-নারী, এরা সকলেই সমাজের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে।
লোকসংস্কৃতির অন্তর্গত লোকসাহিত্যের কথা উঠলেই অনেকে ভাবেন দলিত বা অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষের রচিত সাহিত্যধারার কথা। আসলে সংস্কৃতির বিস্তৃত ও প্রেক্ষাপটকে যথাযথভাবে বিচার-বিশ্লেষণ না করার ফলশ্রুতি এই খন্ডিত বা দ্বিজাতি তত্ত্ব। চর্চার কাল থেকেই অপসারিত হয়ে, বর্তমানকালে প্রযুক্তির নবযুগে এসেছি আমরা।
বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি বলতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশের গণমানুষের সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, ভজন রীতি, পোশাক, উৎসব ইত্যাদির মিথস্ক্রিয়াকে বুঝানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বাঙালিদের রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশের বাঙালি সংস্কৃতি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। বাংলাদেশ পৃথিবীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারণকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। মোটকথা, লোকসংস্কৃতি হচ্ছে লোকমানসের প্রতিবিম্ব। লোকসংস্কৃতির প্রধান উদাহরণ হল চর্যাপদ, এর ৪৬ টি পদ সংখ্যা সকল মূল সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
শতাব্দীর পর শতাব্দি ধরে বাংলাদেশের সংমিশ্রিত সংস্কৃতিতে ইসলাম ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের প্রভাব রয়েছে। এটি সংগীত নিত্য নাটক সহ বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায় ; শিল্প নৈপুণ্য; লোকো কাহিনী লক্ষ্য কথা; ভাষা সাহিত্য; উৎসব উদযাপন; দর্শনধর্ম; স্বতন্ত্র রন্ধন শৈলীতে রন্ধন সম্পর্কীয় ঐতিহ্য।
বাঙালি লোকসংস্কৃতি বলতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিকে বুঝানো হয়। এটি কয়েক শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকের বঙ্গীয় রেনেসাঁ, প্রখ্যাত বাঙ্গালী লেখক, আধুনিক বিজ্ঞানী, গবেষক, চিন্তাবিদ, সংগীত রচয়িতা, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকার বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বেঙ্গল রেনেসাঁর মধ্যে একটি নবজাতক রাজনৈতিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বীজ রয়েছে যা আধুনিক ভারতীয় শিল্পী সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির অনেক উপায়ে অগ্রদূত ছিল।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহ্য হাজার বছরের বেশি পুরনো। সপ্তম শতাব্দীতে লেখা বৌদ্ধ দোহার সংকলন চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বাংলা কাব্য ও গদ্য সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ বাংলা ভাষায় সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলার লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ; ময়মনসিংহ গীতিকায় এর পরিচয় পাওয়া যায়। সংস্কৃতি বলতে যা বোঝাই, লোকসংস্কৃতি তারই একটি অংশ।
সাধারণ মানুষের ভাষা, জীবনবোধ, বিনোদন, সাহিত্য পেশা -এসব নিয়ে গড়ে ওঠে ‘লোকসংস্কৃতি’। এই সংস্কৃতির মধ্যে থাকে সহজে সুর। কোন কৃত্রিমতা থাকে না লোকসংস্কৃতিতে। এটা সহজাত, সহজিয়া আর স্বাভাবিক বহতা নদীর মতো। পোশাকি সংস্কৃতির বিপরীতে এক শক্তিশালী সোঁদা মাটির গন্ধ ভরা সক্রিয় সংস্কৃতি। এর কোন বিনাশ নাই। আছে আধুনিক সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার উদারতার ইতিহাস। তাছাড়া এই সংস্কৃতির ভাষাও লোকজ। যাকে বলা হয় লোকজ ভাষা। সাধারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মুখে, কথায়, ভাষার ব্যবহারে, লেখায় এর প্রকাশ।
সংস্কৃতি সভ্যতা কি দারুন করে, বয়ে নিয়ে চলে। বলা যায় সংস্কৃতি সভ্যতার থেকেও বড়। কারণ, সভ্যতার উত্থান-পতন আছে। হ্রাস-বৃদ্ধি-ক্ষয় আছে; কিন্তু সংস্কৃতি চির অম্লান। প্রবাহমান নদীর মত – রূপান্তর আছে কিন্তু মৃত্যু নেই। সংস্কৃতি একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বহন করে, আচার-আচরণকে প্রভাবিত করে, কখনো দৃশ্যমান ভহয়ে কখনো অন্তর নিহিত হয়।
শুনেছি ও পাঠ অধ্যায়নে জেনেছি সাংস্কৃতির মৃত্যু নেই। তাহলে সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসছে কেন ? সংস্কৃতির উপাদান গুলো যেহেতু জীবন ঘনিষ্ঠ, তাই জীবন বোধের পরিবর্তন বা বিপর্যয় ঘটলে সাংস্কৃতির এসব উপাদানেরও রূপ কিছুটা পাল্টে যায়, ক্ষেত্র বিশেষে পুরোটাই বদলে যায়। তখন সংস্কৃতির যাত্রা পথের রূপান্তর হয়। আমাদের সংস্কৃতি এখন যেন সেই পথেই এগোচ্ছে। গত কয়েক দশকে আমাদের সংস্কৃতির ব্যাপকভাবে বিলুপ্তি ঘটেছে। লোকসংস্কৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে গান, নাটক, পালা গান, পালা নাট্য, জারি-সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, দেহতত্ত্ব, মরমী, ধর্মাশ্রিত, কীর্তন, আধ্যাত্মিকসহ অজস্র লোকসংগীত এর সমৃদ্ধ আমাদের লোকসংস্কৃতি। এর সংগীত ও নাটক জুড়ে ভর করে ব্যক্তি জীবনের আনন্দ, বেদনা, হতাশা, প্রেম, বিরহ, দেহকেন্দ্রীকতা, আধ্যাত্মিকতা প্রকৃতি। লোকসংস্কৃতির আরেকটি মাধ্যম গ্রামীণ খেলাধুলা। এরমধ্যে দাঁড়িয়ে বান্দা, গোল্লাছুট, হাডুডু, এক্কাদোক্কা, কাবাডি, লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অতীতে যাত্রাপালা হতো, পুতুল নাচ হতো, ছোট পূজা-পার্বনে মেলা বসতো, সন্ধ্যা হলে খোলা আকাশের নিচে গল্পের আসর বসতো, হারকেল ও মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে পুঁথি পাঠ হত, উন্মুক্ত আলোচনা চলতো। এসবই হলো সাংস্কৃতির এক একটি উপাদান। আমিও ভালো কিন্তু দুঃখজনকভাবে লোকসংস্কৃতির এ উপাদান গুলো এখন ম্রিয়মাণ হয়ে উঠেছে। এগুলো জৌলুস, প্রচার, প্রসার সবই কমেছে। কিছু কিছু তো একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
সময়ের পরিবর্তন হবে। জীবনধারণ ও প্রতাহিক কাজের রূপ বদলাবে। কিন্তু স্বীয় সংস্কৃতির মূলধারাকে ভুলে গেলে চলবে না। পরিবর্তনের সূত্র মেনে আধুনিক আয়নের ছোঁয়া দিয়ে তাকেও আদরের সন্তানের মত আগলে রাখতে হবে। তবে জাতীয় জীবনে সত্যিকারের উৎকর্ষ ফিরবে।
হাজার বছর ধরে লালন করে আসা সংস্কৃতির এসব ধারা আজ শুকিয়ে যাচ্ছে কেন ? এর কারণ কি কেবল যুগের আধুনিকায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির রমরমা ব্যবহার ? এখন গ্রামীণজীবন, গ্রামীণ মানুষ যেমন অবহেলিত, লোকের সংস্কৃতিও তদ্রুপ। অবহেলায় লোকসংস্কৃতির সহজ সরল ধারা আজ শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে সংঘর্ষে উপনীত হচ্ছে। শহরের জগাখিচুড়ি সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে লোকসংস্কৃতির দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন শক্তি। এছাড়া গণমাধ্যম যেমন রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র প্রভৃতি কোন কোন ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতিকে শুধু দূরে ঠেলেই দিচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে ‘শত্রুর’ ভূমিকা রাখছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম সংস্কৃতি ধারাকে বেশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে; এ কারণে এসবের উপর সংস্কৃতির বিকাশ নির্ভরশীল। কেবল আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবকে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলে অন্যায় হবে। পাশাপাশি আমাদের প্রচেষ্টা ও ইচ্ছা শক্তির অভাব এবং সংস্কৃতি বিমুখ মানসিকতাকেও দায়ী করতে হবে।
লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়, আমাদের অহংকার। এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যেন হারিয়ে না যায়। লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ছাড়া বাঙ্গালী শিকড়হীন পরগাছার মত। নতুন প্রজন্মকে আমাদের লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তাদের মাধ্যমেই যেন আমরা আমাদের লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নতুন মাত্রা যোগ করে বিশ্বের দরবারে আমাদের স্থায়ী আসন ও অস্তিত্ব জানান দিতে পারি।
সার্বিক আলোচনায় দেখা যায় লোকসংস্কৃতি এমন একটা বিষয় যার সঙ্গে আমাদের বিদ্যায়ত্বনিক ও অবিদ্যায়ত্তনিক প্রায় সব বিষয়েরই যোগ রয়েছে। লোকসংস্কৃতির অধ্যায়ন আমাদের একটা সমাজ সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। লোকসংস্কৃতির সংজ্ঞা ও স্বরূপ নিয়ে যেমন মতানৈক্যের শেষ নেই; তেমন এর শাখা প্রশাখায়ও বৈচিত্রের শেষ নেই। এই বৈচিত্রময় বিষয়ের অধ্যায়ন যে সাদামাঠা হবে না তা বলাই বাহুল্য -তাই এর অধ্যায়নেও রয়েছে বিচিত্র সব তত্ত্ব ও পদ্ধতি এক কথায় বলা যায়, সমাজকে নিবিড় ভাবে আত্মস্থ করতে হলে যে বিষয়ের অধ্যায়ন প্রয়োজন তা হচ্ছে লোকসংস্কৃতি। তাই আমার আকুল অনুরোধ, সকল সংস্কৃতিমনা বাঙ্গালীদের বলবো, সাহিত্য ও বাঙালির লোকসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য পুনরায় হোক বাঙালির লোকসংস্কৃতির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
*** সমাপ্ত ***
